সাহিত্য-টীকা-প্রাচীন সূচনা

প্রকীর্ণ শ্লোক ও সংকলন গ্রন্থ

প্রকীর্ণ শ্লোক ও সংকলন গ্রন্থ

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বাঙালির সংস্কৃতচর্চার কথা অবান্তর হলেও আদিযুগের উন্মেষ পর্বের বাংলা সাহিত্যের আলোচনায় বাঙালির সংস্কৃত এবং অপভ্রংশ ভাষার রচনাগুলিকেও অন্তর্ভুক্ত করা যায়। মহাকাব্য, আখ্যানকাব্য এবং রসহীন পাণ্ডিত্যপূর্ণ কাব্য সেকালের বাঙালির তেমন রুচিকর ছিল না। ছোট ছোট সংস্কৃত কবিতা বা প্রকীর্ণ শ্লোক এবং অপভ্রংশ ভাষায় রচিত পদ বাঙালির প্রিয় ছিল।

সংস্কৃত শ্লোকের প্রাচীনতম সংকলন দুটি বাংলাদেশে বাঙালির দ্বারাই গ্রথিত হয়েছিল। এই ঘটনার দ্বারাই প্রমাণ হয় যে এ জাতীয় কবিতার দিকে বাঙালির আগ্রহ বেশি ছিল। অবক্ষয়ী সাহিত্যের যুগগত কারণে দেখা দিয়েছিল সংকলনের প্রবণতা। এইসব ক্ষুদ্র কবিতাগুলির তণ্বী রূপটি সংস্কৃতঘেঁষা কিন্তু তার বিষয় আর কল্পনার অলংকরণ বাঙালি কবির।

আরো পড়ুন--  কপালকুণ্ডলা 1866 খ্রি.

মোটামুটি চারটি সংকলন গ্রন্থের নাম এখানে উল্লিখিত হল-

[ক] কবীন্দ্রবচন্সমুচ্চয় (সুভাষিতরত্নকোষ ) [খ] সদুক্তিকর্ণামৃত বা সূক্তিকর্ণামৃত [গ] বিদগ্ধমুখমণ্ডল [ঘ] মানসোল্লাস ।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব :

  • (ক) খ্যাতিমান প্রাচীন কবির সঙ্গে নবীন অপরিচিত বা সমকালীন কবিদের রচনাসমূহকে একত্রভাবে সন্নিবেশ করা।
  • (খ) সংস্কৃত সাহিত্যের অবক্ষয় এবং রুচি-বিকৃতিকে পূর্ববর্তী কবি-দৃষ্টির ঐতিহ্যের আশ্রয়ে রোধ করার প্রচেষ্টা।
  • (গ) সমকালীন-সচেতনতার অস্ফুট প্রকাশ, দরিদ্র মানুষের জীবনযাপন সম্পর্কে মমতা বা সহনশীলতা।
  • (ঘ) বিষয়-বৈচিত্র্য ও রাজবৃত্তের বাইরে লোকজীবন থেকে কবিতার বিষয়-উপকরণ। সংগ্রহ করার প্রবণতা।
  • (ঙ) সংস্কৃত ভাষা এবং বাংলা ভাষা বা মাতৃভাষার প্রতি কবিদের মমতা প্রকাশ। 
আরো পড়ুন--  গাথাসপ্তশতী

যেমন ‘কবীন্দ্রবচন’ গ্রন্থের একটি আর্যায় একজন বাঙালী কবি লিখেছেন-

ঘন রসময়ী গভীরা রক্তিম সুভগোপজীবিতাকবিভিঃ।

অবগাঢ় চ পুণীতে গঙ্গা বঙ্গাল বাণীষু ।।

অর্থাৎ, গঙ্গা ও বাংলা ভাষায় যারা ডুব দেয়, শুদ্ধতা লাভ করে। গঙ্গা জলপূর্ণ বাংলা ভাষাতেও বিভিন্ন রীতির দৃষ্টান্ত আছে। একটি গৃঢ় ধারায় চলে, অন্যটি মধুর ভাবনায় ভরা। দুয়েই কবিদের আনন্দ।

আরো পড়ুন--  কমলাকান্তের দপ্তর 1875
 
 

Similar Posts

  • অন্যান্য-বৈষ্ণবসাহিত্য · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    ভক্তিরসামৃতসিন্ধু, শ্রীরূপ গোস্বামী

    ভক্তিরসামৃতসিন্ধু   শ্রীচৈতন্যের স্নেহধন্য শ্রীরূপ গোস্বামী (হুসেন শাহের কর্মচারী দবীর খাস)-র বৈষ্ণব রসশাস্ত্র সম্পর্কিত বিখ্যাত গ্রন্থ হল ‘ভক্তিরসামৃতসিন্ধু’। এই গ্রন্থ প্রমাণ করে, শ্রীরূপ ছিলেন একজন বিশিষ্ট কবি ও রসশাস্ত্রের বোদ্ধা। তাঁর এই গ্রন্থের দ্বারা বৈষ্ণব সমাজ তো বটেই, সেইসঙ্গে সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীর বৈষ্ণব পদকর্তারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। জীব গোস্বামী এই গ্রন্থের টীকা রচনা করে নাম দেন ‘দুর্গমসঙ্গমণি’।…

  • আধুনিক-যুগ · পত্র-পত্রিকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    মাসিক পত্রিকা 1854

    মাসিক পত্রিকা ১৮৫৪   প্রকাশকাল/আবির্ভাব ১৮৫৪ সালের ১৬ই আগস্ট ‘মাসিক পত্রিকা’র আত্মপ্রকাশ।  সম্পাদক/পরিচিতি রাধানাথ শিকদার ও প্যারীচাঁদ মিত্র-র উদ্যোগে কলকাতায় মাসিক পত্রিকা নামে ক্ষুদ্র পত্রিকা প্রকাশিত হয়। লক্ষ্য/উদ্দেশ্য ‘মাসিক পত্রিকার প্রধান লক্ষ্য ছিল ভাষাকে সংস্কৃত আনুগত্য থেকে মুক্ত করা, স্ত্রী সমাজ ও বালকদের বোধগম্য করে তোলা। এছাড়া রাধানাথ সহজ সরল বাংলা ভাষার পক্ষপাতী। অক্ষয়কুমারের গদ্য…

  • মঙ্গলকাব্য · মধ্যযুগ · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    জাগরণ পালা, সাহিত্য টীকা

    জাগরণ পালা | সাহিত্য টীকা     সারারাত জেগে নৃত্যগীতের যে অনুষ্ঠান করা হত, মধ্যযুগের বঙ্গদেশে সাধারণত তাকেই ‘জাগরণ’ বা ‘জাগের গান’ বলা হতো। এই জাতীয় গানের মধ্যে উত্তরবঙ্গের ধামালী গান এবং ঝুমুর গানের নাম উল্লেখ করা যায়। এই গানগুলির যে অংশ গভীর রাতে না ঘুমিয়ে পড়ে ভোর পর্যন্ত গাওয়া হতো, তাকেই বলা হতো জাগরণ…

  • অন্যান্য-বৈষ্ণবসাহিত্য · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    উজ্জ্বলনীলমণি, শ্রীরূপ গোস্বামী

    উজ্জ্বলনীলমণি, শ্রীরূপ গোস্বামী শ্রীরূপ গোস্বামীর লিখিত সাহিত্যের উজ্জ্বল নিদর্শন হল ‘উজ্জ্বলনীলমণি’। বৃন্দাবনের ষড়গোস্বামীদের মধ্যে জ্ঞানী ও ভক্ত রূপ গোস্বামী তাঁর এই গ্রন্থে বৈষ্ণব রসতত্ত্বের নানান দিক আলোচনা করেছেন— যা বৈষ্ণব সমাজে বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। ‘উজ্জ্বলনীলমণি’-তে পাঁচটি মুখ্যরসের প্রধানতম যে রস শৃঙ্গার, মধুর বা উজ্জ্বল রস – তাকে অধ্যাত্ম ব্যঞ্জনার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। ‘ভক্তিরসামৃতসিন্ধু’-তে বৈষ্ণব…

  • আধুনিক-যুগ · পত্র-পত্রিকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    সম্বাদ কৌমুদী 1821

    সম্বাদ কৌমুদী ১৮২১         প্রকাশকাল/আবির্ভাব :  সমাচার দর্পণে প্রায়ই হিন্দুধর্ম ও সমাজকে অকারণে গালিগালাজ করা হত। এর প্রতিবিধান করবার জন্য ১৮২১ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর রাজা রামমোহন রায় ও ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘সম্বাদ কৌমুদী’ পত্রিকাটি প্রকাশ করে ‘সমাচার দর্পণে’ প্রকাশিত মিশনারীদের হিন্দুধর্মের প্রতি আক্রমণের যথোপযুক্ত জবাব দেন।   সম্পাদক/পরিচিতি :  সম্বাদ কৌমুদীর প্রথম সম্পাদক…

  • সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    কড়চা কী সাহিত্যে কড়চা

    কড়চা   কোন বিষয়ে প্রশ্নের উত্তরে সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রদানকে ‘কড়চা’ বলে। এর আকার অত্যন্ত ক্ষুদ্র। উৎপত্তিগত অর্থ, কা-চা, র-ড;  তুল-পত্রপত্রিকা হতে পর্চা পাতড়া (তথ্য সূত্র : ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’ জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, পৃষ্ঠা ৪১২)। অন্যমতে, কড়চা শব্দটির উৎস সম্ভবত ‘কারিকা’। ‘কারিকা’ অর্থে সংস্কৃত অভিধানে বলা হয়েছে ‘কারিকা বিবরণ শ্লোক’। কারিকাতু স্বল্পবৃত্তে বহোরহস্য সূচনম”। দিনলিপির (diary) আকারে…