অন্যান্য-বৈষ্ণবসাহিত্য সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

ভক্তিরসামৃতসিন্ধু, শ্রীরূপ গোস্বামী

ভক্তিরসামৃতসিন্ধু

 

শ্রীচৈতন্যের স্নেহধন্য শ্রীরূপ গোস্বামী (হুসেন শাহের কর্মচারী দবীর খাস)-র বৈষ্ণব রসশাস্ত্র সম্পর্কিত বিখ্যাত গ্রন্থ হল ‘ভক্তিরসামৃতসিন্ধু’। এই গ্রন্থ প্রমাণ করে, শ্রীরূপ ছিলেন একজন বিশিষ্ট কবি ও রসশাস্ত্রের বোদ্ধা। তাঁর এই গ্রন্থের দ্বারা বৈষ্ণব সমাজ তো বটেই, সেইসঙ্গে সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীর বৈষ্ণব পদকর্তারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। জীব গোস্বামী এই গ্রন্থের টীকা রচনা করে নাম দেন ‘দুর্গমসঙ্গমণি’।

ভক্তিরসামৃতসিন্ধু চারটি ভাগে বিভক্ত। প্রত্যেক ভাগে আবার অনেকগুলি লহরী বা উপ-পরিচ্ছেদ আছে। বিভাগগুলি হল – পূর্ব, দক্ষিণ, পশ্চিম ও উত্তর।পূর্ব বিভাগে চারটি লহরী। এই লহরীগুলিতে ‘সামান্য ভক্তি’, ‘সাধন ভক্তি’, ‘ভাব ভক্তি’ ও ‘প্রেমভক্তি’ বর্ণিত। পরের বিভাগগুলিতে ভক্তি রসের স্বরূপ বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

আরো পড়ুন--  সম্বাদ কৌমুদী 1821

‘ভক্তিরসামৃতসিন্ধু’-র প্রথম তিন শ্লোকে যথাক্রমে রাধাকান্ত কৃষ্ণের, চৈতন্যের ও গুরু সনাতনের বন্দনা রয়েছে। চৈতন্যবন্দনায় শ্রীরূপ চৈতন্যদেবকে হরির সঙ্গে তুলনা করেছেন।

এই গ্রন্থে শ্রীরূপ দেখিয়েছেন প্রেমভক্তি কেন সর্বশ্রেষ্ঠ ভক্তি। তিনি ভক্তিরসকে সমস্ত স্থায়িভাবের মূলমন্ত্র বলে গ্রহণ করে কৃষ্ণরতিকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, ভক্তিরস দু-ধরনের – পাঁচটি মুখ্য ভক্তিরস এবং সাতটি গৌণ ভক্তিরস। মুখ্য ভক্তিসগুলি হল—শান্ত, প্রীতি, অদ্ভুত, বাৎসল্য, মধুর এবং গৌণ ভক্তিসগুলি হল—হাস্য, অদ্ভুত, বীর, করুণ, রৌদ্র, ভয়ানক, বীভৎস।

এই গ্রন্থের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল – শ্রীরূপ গোস্বামী বৈষ্ণব ভক্তিকে রস রূপে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। তিনি তাঁর পাণ্ডিত্য, মননশীলতা ও যুক্তিবোধ দিয়ে যেভাবে ভক্তিরসের আলংকারিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা বিস্ময়কর। ফলে তাঁর এই ব্যাখ্যার উপর গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের ভিত্তিভূমি অনেকটা গড়ে উঠতে পেরেছিল।

আরো পড়ুন--  অগ্নিবীণা 1922, কাজী নজরুল ইসলাম 

ভক্তিরস একটা শাস্ত্র। রসশাস্ত্র একটা বিজ্ঞান। ষোড়শ শতাব্দীতে শ্রীচৈতন্যদেবের সমসাময়িক রঘুমণি যেমন মিথিলার গৌতমীয় প্রাচীন ন্যায় ভেঙে বাঙালির নব্যন্যায় উদ্ভাবন করেছিলেন তেমনি শ্রীচৈতন্যদেব প্রাচীন রসশাস্ত্রের উপর বাঙালির নূতন রসশাস্ত্র সৃষ্টি করে গেছেন। এই রসসৃষ্টিই ভগবানের সঙ্গে জীবের যত রকম সম্বন্ধ তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ। শ্রীচৈতন্য শ্রীরূপকে এই রসশাস্ত্র সম্বন্ধে জানিয়েছিলেন যার উল্লেখ পাই ‘চৈতন্যচরিতামৃত’-এ

পারাবারশূন্য গম্ভীর ভক্তিরসসিন্ধু।

তোমা চাখাইতে তার কহি একবিন্দু।

(মধ্যলীলা, উনিশ পরিচ্ছেদ)

শ্রীরূপ গোস্বামী ‘ভক্তিরসামৃতসিন্ধু’-তে ভক্তিরসের সেই ব্যাখ্যাই দিয়েছেন। প্রভু শ্রীচৈতন্য শ্রীরূপকে এই ভক্তি সম্বন্ধে বলেছিলেন –

শান্ত দাস্য সখ্য বাৎসল্য মধুর রস নাম।

কৃষ্ণ ভক্তি রস মধ্যে পঞ্চপ্রধান।।

(চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্যলীলা, উনিশ পরিচ্ছেদ)

ভক্তিরসের ব্যাখ্যায় শ্রীরূপ গোস্বামীর বিশ্লেষণ বৈষ্ণব সমাজে ও সাহিত্যে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। এই গ্রন্থটির অপরার্ধ হল ‘উজ্জ্বলনীলমণি’ গ্রন্থ।

আরো পড়ুন--  আর্যাতর্জা কী
 
 
 

Similar Posts

  • ধর্মমঙ্গল · মঙ্গলকাব্য · মধ্যযুগ · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    রামাই পণ্ডিতের শূন্যপুরাণ

    রামাই পণ্ডিতের ‘শূন্যপুরাণ’  রামাই পণ্ডিতের শূন্যপুরাণ-আলোচনা বাংলা সাহিত্যের ধর্মমঙ্গল কাব্য প্রসঙ্গে হয়ে থাকে। ‘শূন্যপুরাণ’ বিষয়ে এই পোস্টে আলোচিত হবে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে  এর মুল্য রয়েছে। শূন্যপুরাণ সমস্যা রামাই পণ্ডিতের ‘শূন্যপুরাণ’-এর কাল নিয়ে কিছুটা সমস্যা দেখা দিয়েছিল। নগেন্দ্রনাথ বসু, দীনেশচন্দ্র সেন প্রমুখ গবেষকগণ শূন্যপুরাণের ভাষাকে খুব পুরানো বলে মনে করেছিলেন। রামাই পণ্ডিতকে তাঁরা দশম-একাদশ শতকের বলে…

  • সাহিত্য-টীকা-প্রাচীন · সূচনা

    সদুক্তিকর্ণামৃত – শ্রীধর দাস

    সদুক্তিকর্ণামৃত     বাংলাদেশে সংকলিত একটি জনপ্রিয় চয়নিকা হল ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’। এই চয়নিকার সংকলক হলেন রাজা লক্ষ্মণসেনের ‘প্রেমৈক পাত্র সখা’ বটুদাসের সুযোগ্য পুত্র ‘মহামাণ্ডলিক’ শ্রীধর দাস। এই চয়নিকাতে দ্বাদশ-ত্রয়োদশ  শতকের বাঙালি জীবন ও সমকালীন সমাজের যে প্রতিফলন প্রতিফলিত হয়েছে, সেদিক থেকে উক্ত গ্রন্থের গুরুত্ব যথেষ্ট। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য এই চয়নিকার প্রভাব অপরিসীম। ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’ সংকলিত…

  • চৈতন্য-চরিত-সাহিত্য · মধ্যযুগ · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    ভক্তিরত্নাকর, নরহরি চক্রবর্তী

    ভক্তিরত্নাকর | নরহরি চক্রবর্তী   দুই নামে একই ব্যক্তি বৈষ্ণবধর্মের সমাজ ও সংস্কৃতির ঐতিহাসিক উপাদান গ্রন্থরূপে ভক্তিবাকর এক স্মরণীয় রচনা। পঞ্চাদশ তরঙ্গে বিভক্ত এই গ্রন্থের বিষয় ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ পর্যন্ত দু’শ বছরের বৈষ্ণব সমাজ ও সম্প্রদায়ের বিবরণদান। তার মধ্যে আবার পঞ্চম তরঙ্গে আছে মার্গ সঙ্গীতের বিশেষ উপস্থাপনা। গ্রন্থকার নরহরি চক্রবর্তী ও ঘনশ্যাম দাস নামে একই…

  • আধুনিক-যুগ · পত্র-পত্রিকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    সোমপ্রকাশ পত্রিকা 1858

    সোমপ্রকাশ পত্রিকা ১৮৫৮       সোমপ্রকাশ আবির্ভাব :  ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই নভেম্বর এই পত্রিকা সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসাবে প্রথম আত্মপ্রকাশ করে।   পরিচিতি :  দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের সম্পাদনায় সোমপ্রকাশ পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয়। তারপর মোহনলাল বিদ্যাবাগীশের হাতে সম্পাদনার ভার দেন এবং শেষের দিকে তাঁর পুত্র উপেন্দ্রকুমার “নবপর্যায় সোমপ্রকাশ” সম্পাদনা করতেন। মাঝে কাবুলে ব্রিটিশ নীতির বিরুদ্ধাচরণ করার…

  • আধুনিক-যুগ · কথাসাহিত্য · সাহিত্য টীকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    কপালকুণ্ডলা 1866 খ্রি.

    কপালকুণ্ডলা 1866 খ্রি. – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কপালকুণ্ডলা উপন্যাসের সাধারণ পরিচিতি দেওয়া হলো। কপালকুণ্ডলা 1866 খ্রি. রচয়িতা : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।  প্রকৃতি : রোমান্সধর্মী ঐতিহাসিক উপন্যাস।  বিষয়বস্তু : প্রকৃতি-দুহিতা ‘বনোন্মওা’ এক নারী বাস্তব সমাজ জীবনে প্রবেশ করে বাস্তবের সংঘাতে কিভাবে আবার প্রকৃতির কোলে ফিরে যায় – ইতিহাস ও রোমান্সের মিশ্রণে সেই কাহিনী আলোচ্য উপন্যাস এর বিষয়বস্তু।  নামকরণ…

  • সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ · রামায়ণ-অনুবাদ

    অদ্ভুত রামায়ণ

    অদ্ভুত রামায়ণ কবি = অদ্ভুত আচার্য। প্রকৃতি = অনুবাদ জাতীয়। বিশেষ কথা = রামায়ণের সাতকাণ্ডের ভাবানুবাদ করেছিলেন কবি। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে রজনীকান্ত চক্রবর্তীর সম্পাদনায় রংপুর সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত হয়। বৈশিষ্ট্য ++ তাঁর কাব্য কৃত্তিবাসের কাব্য অপেক্ষা বৃহদায়তন। ++ পয়ার, ত্রিপদী ছন্দ ও আধুনিক শব্দের প্রচুর প্রয়োগে কাব্যটি উল্লেখযোগ্য। যেমন, রামের বনগমনে কৌশল্যার বিলাপ “আমাকে ছাড়িয়া…