কবীন্দ্র পরমেশ্বর

Last Update : May 13, 2026

কবীন্দ্র পরমেশ্বর : মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কবীন্দ্র পরমেশ্বর এক অবিস্মরণীয় নাম।


কবীন্দ্র পরমেশ্বর: বাংলা মহাভারতের আদি রচয়িতা

## জীবনী ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা

কবীন্দ্র পরমেশ্বর ছিলেন মধ্যযুগের সেই বিরল কবিদের একজন, যাঁদের হাত ধরে হিন্দু মহাকাব্য মুসলিম রাজদরবারে সমাদৃত হয়েছিল। তিনি চট্টগ্রামের লস্কর বা শাসক পরাগ খাঁ-র সভাকবি ছিলেন। পরাগ খাঁ ছিলেন বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের সেনাপতি। সুলতানের নির্দেশে তিনি যখন চট্টগ্রাম শাসন করছিলেন, তখনই তাঁর নির্দেশে এই কাব্য রচিত হয়।

## কাব্যের নাম ও রচনাকাল

আপনার তথ্যানুযায়ী, কাব্যটি ১৪৯৩ থেকে ১৫১৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত। তবে অনেক গবেষক মনে করেন, এটি ১৫১৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে সমাপ্ত হয়েছিল। কাব্যের প্রকৃত নাম ‘পাণ্ডববিজয়’, তবে লোকমুখে এটি ‘পারাগলী মহাভারত’ নামেই অধিক পরিচিত।

আরো পড়ুন--  ইউসুফ জোলেখা কাব্য, শাহ মুহম্মদ সগীর

## নতুন ও প্রাসঙ্গিক তথ্য

আপনার আলোচনার পরিপূরক হিসেবে নিচের পয়েন্টগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক:

  • ১. প্রথম সার্থক অনুবাদক: যদিও পরমেশ্বরের আগে কেউ কেউ মহাভারতের বিচ্ছিন্ন অংশ অনুবাদ করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কবীন্দ্র পরমেশ্বরই প্রথম যিনি মহাভারতের আঠারোটি পর্বের একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু ধারাবাহিক রূপরেখা দান করেন। এই কারণেই তাঁকে বাংলা মহাভারতের ‘আদি কবি’ বলা হয়।
  • ২. মহাভারতের সারসংক্ষেপ: সংস্কৃত মহাভারত বিশাল ও জটিল। পরাগ খাঁ কবিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তিনি অতি বিস্তারে না গিয়ে মূল কাহিনীটি সংক্ষেপে বর্ণনা করেন। ফলে পরমেশ্বরের কাব্যটি মূলত মূল মহাভারতের একটি সারানুবাদ বা ‘সংক্ষিপ্ত সংস্করণ’।
  • ৩. অসাম্প্রদায়িক চেতনা: এই কাব্যে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহকে ‘কলিযুগের কৃষ্ণ’ বলা হয়েছে। এটি সেই সময়ের অসাম্প্রদায়িক ও উদার সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন। সুলতানের প্রশংসা গীতিতে তিনি লিখেছেন—”নৃপতি হোসেন শাহ হয়া মহামতি। / পঞ্চগৌড় নাথ ভোগে দান-বতী॥”
  • ৪. কাব্যের গঠনশৈলী: কাব্যটি মূলত পয়ারত্রিপদী ছন্দে রচিত। এতে সংস্কৃত শব্দের ব্যবহারের চেয়ে দেশজ বাংলা শব্দের ব্যবহার বেশি লক্ষ্য করা যায়, যা সাধারণ মানুষের কাছে একে জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
  • ৫. ঐতিহাসিক গুরুত্ব: ‘পারাগলী মহাভারত’ কেবল একটি ধর্মীয় কাব্য নয়, এটি ষোড়শ শতাব্দীর বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি এবং রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার একটি ঐতিহাসিক দলিল।
আরো পড়ুন--  আর্যাতর্জা কী

## সাহিত্যিক তাৎপর্য

কবীন্দ্র পরমেশ্বরের ‘পাণ্ডববিজয়’ কাব্যটি পরবর্তীকালের কাশীরাম দাসের মহাভারতের মতো কবিত্বময় না হলেও এর একটি ঐতিহাসিক শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। তিনি সংস্কৃতের জটিল জাল থেকে মহাভারতকে মুক্ত করে সাধারণ বাঙালির বোধগম্য ভাষায় পরিবেশন করেছিলেন।


### একনজরে কবীন্দ্র পরমেশ্বর

বিষয়তথ্য
উপাধিকবীন্দ্র (পরাগ খাঁ কর্তৃক প্রদত্ত)
আসল নামপরমেশ্বর দাস
পৃষ্ঠপোষকলস্কর পরাগ খাঁ
কাব্যের ধরনসারানুবাদ (আঠারো পর্বের সংক্ষিপ্ত রূপ)
ঐতিহাসিক গুরুত্ববাংলা সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মহাভারত অনুবাদ

error: সংরক্ষিত !!
Scroll to Top