মহাভারত অনুবাদ সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

কবীন্দ্র পরমেশ্বর

কবীন্দ্র পরমেশ্বর : মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কবীন্দ্র পরমেশ্বর এক অবিস্মরণীয় নাম।


কবীন্দ্র পরমেশ্বর: বাংলা মহাভারতের আদি রচয়িতা

## জীবনী ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা

কবীন্দ্র পরমেশ্বর ছিলেন মধ্যযুগের সেই বিরল কবিদের একজন, যাঁদের হাত ধরে হিন্দু মহাকাব্য মুসলিম রাজদরবারে সমাদৃত হয়েছিল। তিনি চট্টগ্রামের লস্কর বা শাসক পরাগ খাঁ-র সভাকবি ছিলেন। পরাগ খাঁ ছিলেন বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের সেনাপতি। সুলতানের নির্দেশে তিনি যখন চট্টগ্রাম শাসন করছিলেন, তখনই তাঁর নির্দেশে এই কাব্য রচিত হয়।

## কাব্যের নাম ও রচনাকাল

আপনার তথ্যানুযায়ী, কাব্যটি ১৪৯৩ থেকে ১৫১৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত। তবে অনেক গবেষক মনে করেন, এটি ১৫১৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে সমাপ্ত হয়েছিল। কাব্যের প্রকৃত নাম ‘পাণ্ডববিজয়’, তবে লোকমুখে এটি ‘পারাগলী মহাভারত’ নামেই অধিক পরিচিত।

আরো পড়ুন--  ভক্তিরসামৃতসিন্ধু, শ্রীরূপ গোস্বামী

## নতুন ও প্রাসঙ্গিক তথ্য

আপনার আলোচনার পরিপূরক হিসেবে নিচের পয়েন্টগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক:

  • ১. প্রথম সার্থক অনুবাদক: যদিও পরমেশ্বরের আগে কেউ কেউ মহাভারতের বিচ্ছিন্ন অংশ অনুবাদ করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কবীন্দ্র পরমেশ্বরই প্রথম যিনি মহাভারতের আঠারোটি পর্বের একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু ধারাবাহিক রূপরেখা দান করেন। এই কারণেই তাঁকে বাংলা মহাভারতের ‘আদি কবি’ বলা হয়।
  • ২. মহাভারতের সারসংক্ষেপ: সংস্কৃত মহাভারত বিশাল ও জটিল। পরাগ খাঁ কবিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন তিনি অতি বিস্তারে না গিয়ে মূল কাহিনীটি সংক্ষেপে বর্ণনা করেন। ফলে পরমেশ্বরের কাব্যটি মূলত মূল মহাভারতের একটি সারানুবাদ বা ‘সংক্ষিপ্ত সংস্করণ’।
  • ৩. অসাম্প্রদায়িক চেতনা: এই কাব্যে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহকে ‘কলিযুগের কৃষ্ণ’ বলা হয়েছে। এটি সেই সময়ের অসাম্প্রদায়িক ও উদার সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন। সুলতানের প্রশংসা গীতিতে তিনি লিখেছেন—”নৃপতি হোসেন শাহ হয়া মহামতি। / পঞ্চগৌড় নাথ ভোগে দান-বতী॥”
  • ৪. কাব্যের গঠনশৈলী: কাব্যটি মূলত পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দে রচিত। এতে সংস্কৃত শব্দের ব্যবহারের চেয়ে দেশজ বাংলা শব্দের ব্যবহার বেশি লক্ষ্য করা যায়, যা সাধারণ মানুষের কাছে একে জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
  • ৫. ঐতিহাসিক গুরুত্ব: ‘পারাগলী মহাভারত’ কেবল একটি ধর্মীয় কাব্য নয়, এটি ষোড়শ শতাব্দীর বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি এবং রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার একটি ঐতিহাসিক দলিল।
আরো পড়ুন--  ইউসুফ জোলেখা কাব্য, শাহ মুহম্মদ সগীর

## সাহিত্যিক তাৎপর্য

কবীন্দ্র পরমেশ্বরের ‘পাণ্ডববিজয়’ কাব্যটি পরবর্তীকালের কাশীরাম দাসের মহাভারতের মতো কবিত্বময় না হলেও এর একটি ঐতিহাসিক শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। তিনি সংস্কৃতের জটিল জাল থেকে মহাভারতকে মুক্ত করে সাধারণ বাঙালির বোধগম্য ভাষায় পরিবেশন করেছিলেন।


### একনজরে কবীন্দ্র পরমেশ্বর

বিষয়তথ্য
উপাধিকবীন্দ্র (পরাগ খাঁ কর্তৃক প্রদত্ত)
আসল নামপরমেশ্বর দাস
পৃষ্ঠপোষকলস্কর পরাগ খাঁ
কাব্যের ধরনসারানুবাদ (আঠারো পর্বের সংক্ষিপ্ত রূপ)
ঐতিহাসিক গুরুত্ববাংলা সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মহাভারত অনুবাদ

Similar Posts

  • সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ · অন্নদামঙ্গল · মঙ্গলকাব্য · সাহিত্য টীকা

    অন্নদামঙ্গল ১৭৫১ খ্রি.

    অন্নদামঙ্গল ১৭৫১ খ্রি. কবি = রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র। প্রকৃতি = মঙ্গলকাব্য বিষয়ক গ্রন্থ। বিভাগ = অন্নদামঙ্গলের কাহিনি তিন খণ্ডে বিভক্ত-(১) অন্নদামঙ্গল বা পৌরাণিক লৌকিক অংশ, (খ) অন্নপূর্ণা বা মানসিংহ, (গ) কালিকামঙ্গল বা বিদ্যাসুন্দর। প্রথম খন্ডে হরপার্বতী, ব্যাসদেব, হরিহোড় বা ভবানন্দের সঙ্গে অন্নদার দেবমাহাত্ম্যমূলক কাহিনি। দ্বিতীয় খণ্ডে ভবানন্দ-মানসিংহ এবং প্রতাপাদিত্যের ঐতিহাসিক কাহিনি বর্ণিত হয়েছে এবং তৃতীয় খণ্ডে…

  • অন্যান্য-বৈষ্ণবসাহিত্য · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    ভক্তিরসামৃতসিন্ধু, শ্রীরূপ গোস্বামী

    ভক্তিরসামৃতসিন্ধু   শ্রীচৈতন্যের স্নেহধন্য শ্রীরূপ গোস্বামী (হুসেন শাহের কর্মচারী দবীর খাস)-র বৈষ্ণব রসশাস্ত্র সম্পর্কিত বিখ্যাত গ্রন্থ হল ‘ভক্তিরসামৃতসিন্ধু’। এই গ্রন্থ প্রমাণ করে, শ্রীরূপ ছিলেন একজন বিশিষ্ট কবি ও রসশাস্ত্রের বোদ্ধা। তাঁর এই গ্রন্থের দ্বারা বৈষ্ণব সমাজ তো বটেই, সেইসঙ্গে সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীর বৈষ্ণব পদকর্তারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। জীব গোস্বামী এই গ্রন্থের টীকা রচনা করে নাম দেন ‘দুর্গমসঙ্গমণি’।…

  • বিদ্যাপতি

    বিদ্যাপতির জীবন ইতিহাস, Best unique 7 points

    মৈথিল কোকিল বিদ্যাপতির জীবনের নানাদিক নিয়ে এই লেখাটি প্রস্তুত করা হয়েছে। বৈষ্ণব সাহিত্যের শিরোমণি বিদ্যাপতির ব্যক্তিগত জীবনের যতখানি তথ্য এখন জানা সম্ভব তা সংক্ষেপে এখানে উল্লিখিত হল। বিদ্যাপতির জীবন ইতিহাস শুরুর কথা মিথিলার কবি হওয়া সত্ত্বেও বিদ্যাপতি বাঙালির জীবন ও সাধনার সঙ্গে গভীর আত্মীয়তার সূত্রে আবদ্ধ। বিদ্যাপতিকে বাঙালি পরম শ্রদ্ধা-সহকারে বরণ করে নিয়েছে। তাঁর কবিতাবলীর…

  • সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    কড়চা কী সাহিত্যে কড়চা

    কড়চা   কোন বিষয়ে প্রশ্নের উত্তরে সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রদানকে ‘কড়চা’ বলে। এর আকার অত্যন্ত ক্ষুদ্র। উৎপত্তিগত অর্থ, কা-চা, র-ড;  তুল-পত্রপত্রিকা হতে পর্চা পাতড়া (তথ্য সূত্র : ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’ জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, পৃষ্ঠা ৪১২)। অন্যমতে, কড়চা শব্দটির উৎস সম্ভবত ‘কারিকা’। ‘কারিকা’ অর্থে সংস্কৃত অভিধানে বলা হয়েছে ‘কারিকা বিবরণ শ্লোক’। কারিকাতু স্বল্পবৃত্তে বহোরহস্য সূচনম”। দিনলিপির (diary) আকারে…

  • মধ্যযুগ · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    তুর্কি আক্রমণ, বাংলা সাহিত্যে তার প্রভাব

    তুর্কি আক্রমণ । বাংলা সাহিত্যে তার প্রভাব           দ্বাদশ থেকে চতুর্দশ শতক—দেশের ইতিহাসে এক চরম সঙ্কটময় মুহূর্ত। এই সঙ্কটের কারণ প্রধানত ত্রিবিধ : রাজনৈতিক,ধর্মনৈতিক এবং সামাজিক।বলা বাহুল্য এদের কোনটাই পরস্পর হতে বিচ্ছিন্ন নয়,এক যোগে যুক্ত। রাজনৈতিক পরিবর্তন   রাজনৈতিক সংকটের কারণ পর্যালোচনায় দেখা যায় মাত্র দশম থেকে দ্বাদশ শতক,এই দুশো বছরে…

  • ধর্মমঙ্গল · মঙ্গলকাব্য · মধ্যযুগ · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    রামাই পণ্ডিতের শূন্যপুরাণ

    রামাই পণ্ডিতের ‘শূন্যপুরাণ’  রামাই পণ্ডিতের শূন্যপুরাণ-আলোচনা বাংলা সাহিত্যের ধর্মমঙ্গল কাব্য প্রসঙ্গে হয়ে থাকে। ‘শূন্যপুরাণ’ বিষয়ে এই পোস্টে আলোচিত হবে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে  এর মুল্য রয়েছে। শূন্যপুরাণ সমস্যা রামাই পণ্ডিতের ‘শূন্যপুরাণ’-এর কাল নিয়ে কিছুটা সমস্যা দেখা দিয়েছিল। নগেন্দ্রনাথ বসু, দীনেশচন্দ্র সেন প্রমুখ গবেষকগণ শূন্যপুরাণের ভাষাকে খুব পুরানো বলে মনে করেছিলেন। রামাই পণ্ডিতকে তাঁরা দশম-একাদশ শতকের বলে…