কৃত্তিবাস ওঝা: আবির্ভাবকাল ও জীবনবৃত্তান্ত : কৃত্তিবাস ওঝার আবির্ভাবকাল ও সংক্ষিপ্ত জীবনপরিচয় নিচে সুন্দরভাবে সাজিয়ে উপস্থাপন করা হলো:
কৃত্তিবাস ওঝা: আবির্ভাবকাল ও জীবনবৃত্তান্ত
বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের আদি কবি কৃত্তিবাস ওঝা সম্পর্কে মাইকেল মধুসূদন দত্ত যথার্থই বলেছিলেন— “কৃত্তিবাস কীর্তিবাস কবি, এ বঙ্গের অলংকার”। তাঁর রচিত ‘শ্রীরামপাঁচালী’ বা ‘কৃত্তিবাসী রামায়ণ’ বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
১. জন্ম ও বংশ পরিচয়
কৃত্তিবাসের আত্মবিবরণী থেকে তাঁর পূর্বপুরুষ ও পরিবারের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়।
- বংশধারা: কবির পূর্বপুরুষরা মূলত পূর্ববঙ্গের অধিবাসী ছিলেন। সেখানে রাজনৈতিক বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে তাঁরা পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার গঙ্গা তীরবর্তী ফুলিয়া গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন।
- পরিবার: কৃত্তিবাসের পিতার নাম বনমালী এবং মাতার নাম মালিনী। তাঁরা সাত ভাই ও এক বোন ছিলেন। তাঁদের বংশগত পদবি ‘মুখোপাধ্যায়’ হলেও তাঁরা ‘ওঝা’ (উপাধ্যায়) নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন।
২. আবির্ভাবকাল ও জন্ম তারিখ বিতর্ক
কৃত্তিবাসের জন্মকাল নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ রয়েছে। তাঁর আত্মবিবরণীর একটি প্রসিদ্ধ শ্লোক হলো:
“আদিত্যবার শ্রীপঞ্চমী পুণ্য মাঘ মাস
তথি মধ্যে জন্ম লইলাম কৃত্তিবাস।।”
এই শ্লোক এবং জ্যোতিষ গণনার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন গবেষক ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন:
- যুগান্তকারী বছরগুলো: উক্ত শ্লোক অনুযায়ী মাঘ মাসের রবিবার শ্রীপঞ্চমী তিথি পড়েছিল ১৩৫২, ১৩৭২, ১৩৭৫ এবং ১৪৪২ খ্রিস্টাব্দে।
- যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির মত: জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গণনার মাধ্যমে তিনি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, কৃত্তিবাসের জন্ম ১৪৩২ খ্রিস্টাব্দের ১২ই ফেব্রুয়ারি, রবিবার দিবাগত রাত্রে।
- গোপাল হালদারের মত: তিনি কবির জন্মকাল হিসেবে ১৪০৩ খ্রিস্টাব্দকে সমর্থন করেছেন। তাঁর মতে, তৎকালীন গৌড়েশ্বর ছিলেন রাজা গণেশ বা দনুজমর্দনদেব।
- সুখময় মুখোপাধ্যায় ও কানু পিল্লাইয়ের মত: আধুনিক গবেষণায় অধ্যাপক সুখময় মুখোপাধ্যায় জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গল’ ও ধ্রুবানন্দের ‘মহাবংশাবলী’র তথ্যসূত্র ব্যবহার করে কবির আবির্ভাব কাল হিসেবে ১৪৪৩ খ্রিস্টাব্দের ৬ই জানুয়ারি (রবিবার) চিহ্নিত করেছেন। এই মতটি বর্তমানে বেশ জোরালো, কারণ এই সময়ে গৌড়ের সিংহাসনে ছিলেন রুকনুদ্দিন বরবক শাহ, যাঁর সভাকবি হিসেবে কৃত্তিবাসের অবস্থানের ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যায়।
৩. শিক্ষা ও প্রজ্ঞা
কৃত্তিবাস শৈশব থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। আত্মপরিচয় থেকে জানা যায়:
- মাত্র এগারো-বারো বছর বয়সে তিনি উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে গঙ্গা নদী পার হয়ে উত্তরবঙ্গের কোনো এক প্রখ্যাত গুরুগৃহে গমন করেন।
- সেখানে শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি রাজপণ্ডিত হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে গৌড়ের রাজসভায় উপস্থিত হন।
৪. গৌড়েশ্বরের সাক্ষাৎ ও কাব্য রচনা
গৌড়েশ্বরের সভায় নিজের পাণ্ডিত্য জাহির করার জন্য তিনি পাঁচটি শ্লোক রচনা করে রাজাকে উপহার দেন। কবির ভাষায়:
“রাজপণ্ডিত হব মনে আশা করে।
পঞ্চশ্লোক ভেটিলাম রাজা গৌড়েশ্বরে।।”
রাজা তাঁর পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে রাজকীয় সম্মান প্রদান করেন এবং কবিকে অনুরোধ করেন বাল্মীকি রামায়ণের একটি সুললিত বাংলা অনুবাদ রচনা করতে। রাজার সেই অনুরোধ এবং উৎসাহেই কৃত্তিবাস বাঙালির প্রাণের আখ্যান ‘শ্রীরামপাঁচালী’ রচনা করেন।
মূল্যায়ন: কৃত্তিবাসের আবির্ভাবকাল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, চতুর্দশ বা পঞ্চদশ শতাব্দী যে বাংলা সাহিত্যের এই মহীরুহের সৃষ্টির সময় ছিল, সে বিষয়ে প্রায় সকল গবেষকই একমত। তাঁর হাত ধরেই সংস্কৃত মহাকাব্য বাঙালির নিজস্ব ভাষায় প্রথম মর্যাদা লাভ করে।