সাহিত্য-টীকা-প্রাচীন সূচনা

সুভাষিত রত্নকোষ বা কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়

সুভাষিত রত্নকোষ

তুর্কী আক্রমণ-পূর্ব বাংলাদেশে কবিতাকৃতির সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন হল ‘কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়’ (‘সুভাষিত রত্নকোষ’)। ‘কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়’-এর পুঁথি নেপালে পাওয়া যায়। নেওয়ালি অক্ষরে লিখিত এই খণ্ডিত পুথি সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন এফ. ডবলিউ. টমাস ১৯১২ সালে। পুঁথিটির প্রথম দিকের কিছু অংশ নষ্ট হওয়ায় এর প্রকৃত নাম কি ছিল তা জানা যায়নি। টীকার এক জায়গায় ‘কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়’ এই শব্দগুলি আছে বলে টমাস সাহেব এই সমগ্র পুঁথিটিকে ঐ নামে চিহ্নিত করেন। তখনো মূল সংকলকের নাম ছিল অজ্ঞাত। ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্পূর্ণ গ্রন্থটি সম্পাদিত ও প্রকাশিত হয়েছে। তাতে সংকলক ও সংকলনের নাম পাওয়া গেছে যথাক্রমে বিদ্যাধরএবং ‘সুভাষিত রত্নকোষ’। পুঁথিটির লিপি প্রাচীনতা দেখে স্থির করা হয়েছে যে, পুঁথিটির লিপিকাল ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের পরবর্তী নয়। তখন বঙ্গে পাল রাজত্ব চলছে। অনুমান করা হয় যে, সংকলক বিদ্যাধর বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ছিলেন ; কারণ প্রথম দিকের শ্লোকে বুদ্ধবর্ণনা আছে।

‘সুভাষিত রত্নকোষ’ সংস্কৃত ভাষায় রচিত প্রথম সংকলিত শ্লোক কাব্য। এর আগে প্রকীর্ণ শ্লোক সংগ্রহের অনুরূপ উদ্যম আর দেখা যায়নি। আর এই প্রথম শ্লোককাব্য প্রায় আড়াই’শ জন কবির ১৭৩৮টি শ্লোক সংগৃহীত হয়েছে। এই কবিদের মধ্যে অনেকে বাঙালি ছিলেন বলে মনে করা হয়। সুতরাং এই সংকলনটিকে বাঙালির নিজস্ব সম্পদ বলে গ্রহণ করা যায়। অনেক কবি ছিলেন বাঙালি। যেমন- বসুকল্প, সঙ্ঘশ্রী, পুরুষোত্তম দেব, অভিনন্দ, মধুশীল, বীর্য মিত্র, বৈদ্য ধন্য, হিম্বোক, সিদ্ধোক প্রভৃতি বাঙালি ছিলেন বলে মনে করা হয়।

আরো পড়ুন--  সবুজ পত্র 1914

কৃষ্ণের ব্রজলীলা দ্বাদশ শতকেও পূর্বেকার বাঙালির কতটা আদরণীয় ছিল, তার সুন্দর প্রমাণ পাওয়া যায় এই সংকলনে। অনেকগুলি হরি বিষয়ক কবিতা আছে। পরবর্তীকালে বৈষ্ণব পদাবলিতে যে লীলারস বর্ণিত হয়েছে, তার সুস্পষ্ট আভাস কয়েকটি কবিতায় রয়েছে। এই সংকলনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কবিতাই আদিরসাত্মক। এই সংগ্রহ থেকে সেকালের বাঙালির সাহিত্যিক রুচি সম্বন্ধে অনেক তথ্য জানা যায়। বাঙালি একদিকে যেমন টুকরো টুকরো কবিতায় বাস্তবচিত্রণে কুশলতা অর্জন করেছিলেন, তেমনই আদিরসাত্মক কবিতার প্রতিও তার আসক্তি বৃদ্ধি পেয়েছিল। পরবর্তীকালের ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’ ও জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দে’ তার প্রমাণ আছে। এতে রাধাকৃষ্ণের প্রণয়লীলা বিষয়ক অনেকগুলি শ্লোক সংযোজিত হয়েছে। বাংলাদেশের পরবর্তী সংস্কৃতির সঙ্গে এখানেই এর নাড়ীর যোগ রয়েছে। লক্ষ্মণসেনের রাজসভাকে কেন্দ্র করে যে আদিরসাত্মক ভক্তিবাদের ধারা প্রবাহিত হয়, তার উৎস এই ‘কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়’ বা ‘সুভাষিত রত্নকোষ’-এর রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক শ্লোকের মধ্যে নিহিত।

সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘সংস্কৃত সাহিত্যে বাঙালির দান’ গ্রন্থে জানিয়েছেন, ‘সুভাষিত রত্নকোষ’-এর অংশবিশেষ হল ‘কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়’ নামক সংকলন গ্রন্থ। এই সংকলনের সম্পাদক এফ.ডবলিউ. টমাস সমগ্র পুঁথিকে ‘কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়’ নামে অভিহিত করেছেন। এই গ্রন্থের সঙ্কলয়িতা কে তা জানা যায় না।তবে সঙ্কলয়িতা যে একজন বৌদ্ধ ছিলেন তার প্রমাণ হল এই গ্রন্থের প্রথম দুটি ‘ব্রজ্যা’য় বৌদ্ধ কবিতাগুলি সংগৃহীত হয়েছে। সম্ভবত কোন বাঙালি ছিলেন এর সংকলক; কারণ কবিতাসমষ্টির অনেকগুলো বাঙালি কবিদের (গৌড় অভিনন্দ, মধুশীল, শ্রীধর নন্দী) রচনা। গ্রন্থটিতে মোট ৫২৫টি কবিতা আছে। কবিরা কেউই একাদশ শতাব্দীর পরবর্তী নয়।  তাই খ্রিস্টীয় একাদশ-দ্বাদশ শতকের মধ্যে গ্রন্থখানি সংকলিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়।

আরো পড়ুন--  প্রাকৃতপৈঙ্গল

গ্রন্থের কবিতাগুলি লিরিকধর্মী। বিভিন্ন ঋতুর বর্ণনা বেশ লাবণ্যময়। ‘হরিব্রজ্যায়’ উদ্ধৃত শ্লোকগুলিতে রাধা-কৃষ্ণ লীলার মধুর রসের পরিচয় পাওয়া যায়। এভাবে ‘ব্রজ্যা’ ক্রমে সংকলনের কবিতাগুলি সজ্জিত। প্রথমেই ‘সুগত ব্রজ্যা’। তারপর ‘লোকেশ্বর ব্রজ্যা’। তারপর ‘হরিব্রজ্যা’ ও ‘সূর্যব্রজ্যা’। এরপর ‘বসন্ত’, ‘মালিনী’, বিরহিণী’ প্রভৃতি ব্রজ্যা।

‘হরিব্রজ্যা’য় ২১ নং শ্লোকে রাধা কৃষ্ণের রহস্যমধুর চিত্রের পরিচয় রয়েছে। যেমন,

কোহয়ং দ্বারি হরিঃ প্রয়াহুপবনং শাখা মৃগেনাত্র কিং

কৃষোহহং দয়িতে বিভেমি সুতরাং কৃষ্ণ কথা বানরঃ ।

মু্গ্ধেহহং মধুসূদনো ব্রজ লতাং তামেব পুষ্পসবাম্‌

ইত্থং নির্বচনীকৃতো দয়িতয়া হ্রীণো হরিঃ পাতু বঃ।।

অনুবাদ : “দ্বারে কে ও? হরি। শাখামৃগের এখানে প্রয়োজন কি? উপবনে যাও। ওগো দয়িতে, আমি কৃষ্ণ। কৃষ্ণ! তবে তাকে আরও ভয় পাইতেছি। বানর কি কালো? ওগো মুক্ধে, আমি মধুসূদন। তাহা হইলে মধু পুষ্পলতার কাছে যাও। প্রিয়াদ্বারা এই প্রকারে নিরুত্তরীকৃত লজ্জিত হরি তোমাদিগকে রক্ষা করুন।” (জাহ্নবীকুমার চক্রবর্তী –  প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য ও বাঙালীর উত্তরাধিকার – দ্বিতীয় খণ্ড)

আরো পড়ুন--  জাগরণ পালা, সাহিত্য টীকা

রাধাকৃষ্ণের লীলা বর্ণিত হয়েছে জয়দেবের গীতগােবিন্দে এবং পরবর্তীকালের বৈষ্ণব পদাবলীতে। আসলে কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়’ গৌড়ীয় রাধাকৃষ্ণ লীলার প্রাক্রূপ। বিরহিণী বা অসতীব্রজ্যায় যেসব লৌকিক প্রেমের কবিতা রয়েছে, তার প্রভাব পড়েছে বৈষ্ণব পদাবলীতে। রাধা কৃষ্ণের প্রেমের সূক্ষ্মতা ও সৌকুমার্য সম্পাদনে বৈষ্ণব পদকর্তাগণ ‘কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয় শ্লোক গুলোর কাছে ঋণী।

মিলনের ক্ষণকে দীর্ঘতর করবার জন্য ভাবী বিরহের আশঙ্কায় শঙ্কিতা নায়িকার কাতরোক্তি পরবর্তী বৈষ্ণব পদকর্তাদের প্রভাবিত করেছে। সুতরাং সংস্কৃত ভাষায় প্রকীর্ণ কবিতা রচনায় বাঙালি কবিকুল একাদশ শতকের আগেই যে সাবলীলতা অর্জন করেছিলেন, তার ঐতিহাসিক দলিল ‘সুভাষিত রত্নকোষ’।

 

 
 

Similar Posts

  • আধুনিক-যুগ · পত্র-পত্রিকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    সমাচার চন্দ্রিকা 1822

    সমাচার চন্দ্রিকা ১৮২২   প্রকাশকাল/আবির্ভাব রামমোহনের হিন্দুধর্ম ও সমাজ সম্বন্ধে অতিশয় আধুনিক ও প্রগতিশীল মতের সঙ্গে কিছু রক্ষণশীল স্বভাব ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাল মিলিয়ে চলতে না পারার ফলে দু’জনের মতভেদ হয়ে গেল। রামমোহনের সঙ্গ এবং ‘সম্বাদ কৌমুদী’র সংস্পর্শ ত্যাগ করে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮২২ সালে ‘সমাচার চন্দ্রিকা নামে সুপ্রসিদ্ধ পত্রিকা বার করেন।  আরো পড়ুন–  চর্যাপদের সাহিত্যমূল্য ও কাব্যিক…

  • মঙ্গলকাব্য · মধ্যযুগ · মনসামঙ্গল · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    বাইশা বা বাইশ কবির মনসামঙ্গল

    বাইশা বা বাইশ কবি বহুশ্রুতি এবং বহুকবির চিন্তাচর্চায় মনসামঙ্গল কাব্যধারা বিকশিত হয়ে ওঠে। তবে দৈনন্দিন পূজা ও পাঠে ঘটে জনপ্রিয়তা এবং কাব্যের কোজাগরী প্রতিষ্ঠা লাভ হয় পূর্ববঙ্গে। কাব্যটিকে ভালোবাসার জন্য স্বভাবতই ভালো লাগার উপযোগী বিভিন্ন কবির রচিত পংক্তিগুচ্ছকে একটি সঙ্কলনের মাধ্যমে গ্রথিত করে একটি সম্মেলক কাব্য বা সঙ্গীত সংকলনের অস্তিত্ব থাকা ছিল খুব স্বাভাবিক ঘটনা।…

  • সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ · রামায়ণ-অনুবাদ

    অদ্ভুত রামায়ণ

    অদ্ভুত রামায়ণ কবি = অদ্ভুত আচার্য। প্রকৃতি = অনুবাদ জাতীয়। বিশেষ কথা = রামায়ণের সাতকাণ্ডের ভাবানুবাদ করেছিলেন কবি। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে রজনীকান্ত চক্রবর্তীর সম্পাদনায় রংপুর সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত হয়। বৈশিষ্ট্য ++ তাঁর কাব্য কৃত্তিবাসের কাব্য অপেক্ষা বৃহদায়তন। ++ পয়ার, ত্রিপদী ছন্দ ও আধুনিক শব্দের প্রচুর প্রয়োগে কাব্যটি উল্লেখযোগ্য। যেমন, রামের বনগমনে কৌশল্যার বিলাপ “আমাকে ছাড়িয়া…

  • চর্যাপদ · সাহিত্য-টীকা-প্রাচীন

    চর্যাপদের সাহিত্যমূল্য ও কাব্যিক সৌন্দর্য

    চর্যাপদের সাহিত্যমূল্য ও কাব্যিক সৌন্দর্য : চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া সিদ্ধাচার্যদের গুহ্য সাধনতত্ত্বের সংকলন হলেও, এর পরতে পরতে জড়িয়ে আছে অনন্য কবিত্বশক্তি এবং সাহিত্যিক সুষমা। চর্যাপদের কাব্যমূল্য ও সাহিত্যিক গুরুত্ব নিচে বিশ্লেষণাত্মকভাবে সাজিয়ে উপস্থাপন করা হলো। চর্যাপদের সাহিত্যমূল্য ও কাব্যিক সৌন্দর্য সিদ্ধাচার্যরা কাব্যচর্চার উদ্দেশ্যে চর্যাপদ রচনা করেননি, কিন্তু তাঁদের সাধনতত্ত্ব যখন লৌকিক জীবনের উপমা আর…

  • মঙ্গলকাব্য · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    বারমাস্যা বা বারমাসী

    বারমাস্যা বা বারমাসী   ‘বারমাস্যা’ বা ‘বারমাসী’ কথাটির অর্থ বারো মাস, অর্থাৎ একটা গোটা বৎসরের বিবরণ। প্রাচীন সাহিত্য বা মধ্যযুগের বাংলা কাব্যে লৌকিক কাহিনী বর্ণনায় নায়ক-নায়িকার বারো মাসের সুখ-দুঃখের বিবরণ আছে। মঙ্গলকাব্যে এটি এক বিশেষ লক্ষণ বা রীতি হয়ে উঠেছে। ‘বারমাসী’ কবিতাগুলির বৈশিষ্ট্য হল : (১) বারো মাস এবং ছয় ঋতুর আবর্তনের মধ্য দিয়ে মানবচিত্তের…

  • সাহিত্য-টীকা-আধুনিক · কাব্য কবিতা

    অগ্নিবীণা ১৯২২ খ্রি.

    অগ্নিবীণা (১৯২২ খ্রি.) কবি = কাজী নজরুল ইসলাম। প্রকৃতি = কাব্যগ্রন্থ। মূল বিষয় = বিংশ শতকের প্রথম দুই দশকে ভারতবর্ষে নতুন জীবন, নতুন সম্ভাবনার অভিব্যক্তি ও দেশাত্মবোধ এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলিতে প্রকাশিত। বৈশিষ্ট্য ও বিশেষ কথা = ‘অগ্নিবীণা’ নজরুলের প্রথম ও প্রধান কাব্যগ্রন্থ। = নজরুলের বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা এই কাব্যের অন্তর্গত। = গ্রন্থটিতে মোট বারটি (১২টি)…