প্রাচীনযুগ সাহিত্য-টীকা-প্রাচীন

চর্যাপদের রচনাকাল

চর্যাপদ বা চর্যাগান কিংবা চর্যাগীতি হলো বাংলা ভাষার আদিতম নিদর্শন। এখন এই পদ বা গানগুলির রচনাকাল নিয়ে নানা ধোঁয়াশা থাকবে তা স্বাভাবিক। এই লেখায় চর্যাপদের রচনাকাল সম্বন্ধে সাধারণ কিছু কথা তুলে ধরা হয়েছে।

চর্যাপদের রচনাকাল বা চর্যাগীতির রচনাকাল

প্রাচীন বাংলাভাষার অদ্বিতীয় নিদর্শন চর্যাপদ শুধু  ভাষা এবং ধর্মের রহস্যইসূচীভেদ্য নয়, তার রচনাকালও সংশয়ান্বিত। ভাষাতত্ত্বের দুই প্রতিনিধিস্থানীয় পণ্ডিত ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এ সম্বন্ধে ছিলেন ভিন্ন মতাবলম্বী।

ড. সুনীতিকুমারের ও ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচী মতে, চর্যাগুলি খ্রিস্টীয় ১০ম-১২শ শতকের মধ্যে রচিত। ড. শহীদুল্লাহ এবং পণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়নের মতে, দোহা ও চর্যার রচনাকালকে আরো দু’শ বছর পিছিয়ে দিয়ে ৮ম-১২শ শতকের অন্তর্ভূক্ত করা উচিত।

রাহুল সংকৃত্যায়ন ‘পুরাতাত্ত্বিক নিবন্ধাবলী’ গ্রন্থে দেখাতে চেয়েছেন লুইপাদ এবং সরহপাদ দুজন প্রাচীন সিদ্ধাচার্য ধর্মপালের সমসাময়িক (৭৬৯-৮০৯ খ্রিস্টাব্দ); ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ‘সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা’র আলোচনায় ভুসুকু ও কাহ্নপাদকে ৮ম শতাব্দীর অন্তর্ভুক্ত করতে প্রয়াসী।

আরো পড়ুন--  গাথাসপ্তশতী

চর্যাপদগুলোর সংকলনের আবিষ্কারক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেন যে, লুইপার ‘অভিসময়বিভঙ্গ’ গ্রন্থ রচনার সময়ে প্রসিদ্ধ বৌদ্ধ আচার্য দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান সাহায্য করেছিলেন। কথিত আছে,৫৮ বছর বয়সে শ্রীজ্ঞান তিব্বত যান (অর্থাৎ ১০৩৮ খ্রিস্টাব্দ)। সেক্ষেত্রে লুইপাদ ১০ম শতাব্দীর নিকটবর্তী সময়ে আবির্ভূত হওয়া যুক্তিযুক্ত। তিব্বতী কিংবদন্তী অনুসারে লুইপাদ সিদ্ধাচার্যদের আদি গুরু। সুতরাং এই সূত্র অনুসারে চর্যা রচনার প্রাচীনতম সীমা ১০ম শতাব্দীর শেষ ভাগ পর্যন্ত মনে করা যেতে পারে।

ড. সুনীতিকুমার তার ‘The Origin and Development of Bengali Language’ নামক গ্রন্থে এবং ড.প্রবোধচন্দ্র বাগচী তাঁর ‘Dohakosa’ গ্রন্থে চর্যার রচনা সময় ১০ম-১২শ শতাব্দীর মধ্যে মনে করেছেন। কাহ্নপাদ-গোরক্ষনাথের আনুমানিক আবির্ভাবকাল ধরে ড. সুনীতিকুমারের সিদ্ধান্ত,চর্যাণ্ডলি ঐ ৯৫০ হতে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত। তাঁর মতে, শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ভাষা মধ্যযুগীয় বাংলা ভাষার প্রথম স্তরের অন্তর্ভুক্ত;এর রচনাসীমা আনুমানিক ১৪শ শতকের শেষভাগ। চর্যার ভাষা এর অপেক্ষা দেড়শ বছর পূর্বের রচনা;অর্থাৎ ভাষাতত্ত্বের বিচারেও এর অনেক পদ ১২শ শতাব্দীতে রচিত বলে মনে হয়।

আরো পড়ুন--  সবুজ পত্র 1914

অন্যান্য যুক্তি

১. কাহ্নপাদ ও গোরক্ষনাথের আবির্ভাবের আনুমানিক কাল ধরে চর্যার রচনাকালের সীমা নির্ধারণ করা অসম্ভব নয়। কেননা পণ্ডিতাচার্য শ্রীকৃষ্ণপাদ রচিত ‘হেবজ্রপঞ্জিকা যোগরত্নমালা’ নামক একটি বৌদ্ধ তান্ত্রিক গ্রন্থ পালবংশের শেষ রাজা গোবিন্দ পালের সময় (আনুমানিক ১১৭৯ খ্রিস্টাব্দে) রচিত হয়। সুনীতিকুমারের মতে, তিব্বতে একাধিক কাহ্নপাদের উল্লেখ সত্ত্বেও চর্যার কাহ্নপাদ এবং এই বৌদ্ধতন্ত্র গ্রন্থের পণ্ডিত আচার্য শ্রীকৃষ্ণপাদ অভিন্ন ব্যক্তি; কারণ চর্যার এক স্থলে কাহ্নপাদ ‘পণ্ডিতয়াচায়ে’ অর্থাৎ ‘পণ্ডিতাচার্য’ বলে উল্লেখিত হয়েছেন। কাহ্নপাদের কোন কোন টীকায় ‘কৃষ্ণচার্য’নামটিও পাওয়া যায়।

আরো পড়ুন--  চর্যাপদের বহুমুখী গুরুত্ব

২.  নাথ সাহিত্যে বা নাথ ধর্মের সাক্ষ্য-অনুযায়ী গোরক্ষনাথের শিষ্য হলেন জালন্ধর পাদ বা হাড়িপা এবং তাঁরই শিষ্য কানুপা বা কাহ্নপাদ।

৩.  মারাঠী গ্রন্থ ‘জ্ঞানেশ্বরী’ (আনুমানিক ১২৯০ খ্রিস্টাব্দ) হতে মনে হয়, উক্ত গ্রন্থের লেখক জ্ঞানদেব তাঁর অগ্রজ নিবৃত্তিনাথের কাছে দীক্ষালাভ করেন ১২৭৩ খ্রিস্টাব্দে। নিবৃত্তিনাথের গুরু ছিলেন গেইনীনাথ বা গোয়নীনাথ (মতান্তরে জ্ঞানীনাথ)। এই গেইনীনাথের দীক্ষা গুরু হলেন গোরক্ষনাথ। তাঁর শিষ্য জালন্ধরি পাদ, তাঁরই শিষ্য কৃষ্ণপাদ বা কাহ্নপাদ। অতএব অনুমান হয় যে, কৃষ্ণপাদের আবির্ভাবকাল সম্ভবত ১২শ শতাব্দী।

এইসব তথ্য প্রকাশের ফলে চর্যাপদের রচনাকালকে স্থূলত ১০ম—১২শ শতাব্দীর মধ্যে স্থাপন করা যেতে পারে বলে অধিকাংশ পণ্ডিত মনে করেন।


সাহায্য : পার্থ চট্টোপাধ্যায়

Similar Posts

  • সাহিত্য-টীকা-প্রাচীন · সূচনা

    প্রাকৃতপৈঙ্গল

    প্রাকৃতপৈঙ্গল প্রাকৃতপৈঙ্গল কী? ভাব, বিষয়বস্তু ও ভাষা-কৌশলের দিক থেকে এই গ্রন্থটি বাঙালী জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। গ্রন্থটি শৌরসেনী প্রাকৃত ও অপভ্রংশে লেখা হয়। বিভিন্ন কবি-রচিত শ্লোকের সঙ্কলন। সংকলকের নাম, পিঙ্গল। ইনি ‘পিঙ্গল ছন্দসূত্র‘ গ্রন্থাকার নন। পণ্ডিতজনের অনুমান, ১৪শ শতাব্দীতে কাশীধামে ‘প্রাকৃতপৈঙ্গল’ সঙ্কলিত হয়। এই গ্রন্থেও রাধা ও গােপালীলার উল্লেখ আছে, আছে বিভিন্ন দেবদেবীর…

  • সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ · অন্নদামঙ্গল · মঙ্গলকাব্য · সাহিত্য টীকা

    অন্নদামঙ্গল ১৭৫১ খ্রি.

    অন্নদামঙ্গল ১৭৫১ খ্রি. কবি = রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র। প্রকৃতি = মঙ্গলকাব্য বিষয়ক গ্রন্থ। বিভাগ = অন্নদামঙ্গলের কাহিনি তিন খণ্ডে বিভক্ত-(১) অন্নদামঙ্গল বা পৌরাণিক লৌকিক অংশ, (খ) অন্নপূর্ণা বা মানসিংহ, (গ) কালিকামঙ্গল বা বিদ্যাসুন্দর। প্রথম খন্ডে হরপার্বতী, ব্যাসদেব, হরিহোড় বা ভবানন্দের সঙ্গে অন্নদার দেবমাহাত্ম্যমূলক কাহিনি। দ্বিতীয় খণ্ডে ভবানন্দ-মানসিংহ এবং প্রতাপাদিত্যের ঐতিহাসিক কাহিনি বর্ণিত হয়েছে এবং তৃতীয় খণ্ডে…

  • সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    কড়চা কী সাহিত্যে কড়চা

    কড়চা   কোন বিষয়ে প্রশ্নের উত্তরে সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রদানকে ‘কড়চা’ বলে। এর আকার অত্যন্ত ক্ষুদ্র। উৎপত্তিগত অর্থ, কা-চা, র-ড;  তুল-পত্রপত্রিকা হতে পর্চা পাতড়া (তথ্য সূত্র : ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’ জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, পৃষ্ঠা ৪১২)। অন্যমতে, কড়চা শব্দটির উৎস সম্ভবত ‘কারিকা’। ‘কারিকা’ অর্থে সংস্কৃত অভিধানে বলা হয়েছে ‘কারিকা বিবরণ শ্লোক’। কারিকাতু স্বল্পবৃত্তে বহোরহস্য সূচনম”। দিনলিপির (diary) আকারে…

  • আধুনিক-যুগ · কথাসাহিত্য · সাহিত্য টীকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    কমলাকান্তের দপ্তর 1875

    কমলাকান্তের দপ্তর 1875 : বঙ্কিমচন্দ্রের কমলাকান্তের দপ্তুর রচনা সম্পর্কে টীকা। কমলাকান্তের দপ্তর 1875 লেখক : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। প্রকৃতি : মননশীল প্রবন্ধ । ‘কমলাকান্তের দপ্তর ’ একটি বিশিষ্ট মননশীল প্রবন্ধ।  বক্তব্য : কমলাকান্ত চক্রবর্তী নামে এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ প্রসন্ন গোয়ালিনীর দধি -দুগ্ধে প্রতিপালিত হয়ে নাসিরামবাবু প্রদত্ত আফিং বটিকা সেবন করে এবং যএতএ ঘুরে বেড়িয়ে জীবনের যে অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি…

  • সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ · রামায়ণ-অনুবাদ

    অদ্ভুত রামায়ণ

    অদ্ভুত রামায়ণ কবি = অদ্ভুত আচার্য। প্রকৃতি = অনুবাদ জাতীয়। বিশেষ কথা = রামায়ণের সাতকাণ্ডের ভাবানুবাদ করেছিলেন কবি। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে রজনীকান্ত চক্রবর্তীর সম্পাদনায় রংপুর সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত হয়। বৈশিষ্ট্য ++ তাঁর কাব্য কৃত্তিবাসের কাব্য অপেক্ষা বৃহদায়তন। ++ পয়ার, ত্রিপদী ছন্দ ও আধুনিক শব্দের প্রচুর প্রয়োগে কাব্যটি উল্লেখযোগ্য। যেমন, রামের বনগমনে কৌশল্যার বিলাপ “আমাকে ছাড়িয়া…

  • চৈতন্য-চরিত-সাহিত্য · বৈষ্ণব-সাহিত্য · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    কবি চূড়ামণি দাসের কবি পরিচয়, গৌরাঙ্গবিজয় কাব্যের পরিচয়

    কবি চূড়ামণি দাস ও তাঁর কাব্য গৌরাঙ্গবিজয় কাব্যের কথা   কয়েকখানি চৈতন্যচরিত গীতিকাব্য ‘পাঁচালী প্রবন্ধ’ রীতিতে রচিত হয়েছিল। তার মধ্যে একটি অংশতঃ, আর একটি সম্পূর্ণ। চূড়ামণি দাসের ‘গৌরাঙ্গ বিজয়’ কাব্যটি অসম্পূর্ণ। সম্ভবতঃ সপ্তদশ শতকের শেষার্ধে গ্রন্থটি লেখা হয়। আদি, মধ্য, অস্ত্য খণ্ডে গ্রন্থটির কথা ও কাহিনী বিভক্ত। লাচাড়ি অংশের তুলনায় ‘শিকলি‘ অংশই বেশি। নিত্যানন্দ অনুচর…