সাহিত্য-টীকা-প্রাচীন সূচনা

রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজসভায় সাহিত্যচর্চা

রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজসভায় সাহিত্যচর্চা

লক্ষ্মণসেনের রাজসভায় ‘পঞ্চরত্ন’-এর সমাবেশ ঘটেছিল; এঁরা হলেন কবি জয়দেব, উমাপতি ধর, শরণ, ধোয়ী, গোবর্ধন আচার্য। জয়দেবের গীতগোবিন্দে’র প্রশস্তি-শ্লোক, সুভাষিতাবলীর (১৫শ শতাব্দী) শ্লোক এবং ‘বৈষণবতাষণী’ টীকা-গ্রন্থের সাক্ষ্যে মনে হয়, এঁরা ছিলেন সমসাময়িক। জয়দেবের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন স্বরাজ্যে সম্রাট।

উমাপতি ধর

উমাপতি ধরের কাব্যকলার পরিচয় বহন করছে দেওপাড়া এবং মাধাই নগরের প্রশস্তিলিপি এবং ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’-এর একানব্বইটি শ্লোক। তাঁর রচনার প্রধান লক্ষণীয় বিশেষত্ব হল, বাক্যের পল্লবিত বিস্তার তথা গৌড়ী রীতির চূড়ান্ত অনুসরণ। অবশ্য সহজবোধ্য পংক্তি কিছু পাওয়া যায় এইসব শ্লোকের মধ্যে; যেমন-

বাচঃ পরং ভজন্ত্যেতা দেবি প্রণয়চাতুরীম্‌।

হৃদয়স্য তু সর্বস্বং ত্বমেবৈকপ্রিয়া মমম্।।

তবে এই সংকলন গ্রন্থে আর এক কবি উমাপতির কথা জানা যায়। ইনি রাজা চাণক্য চন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘চন্দ্রচূড়’ কাব্য রচনা করেছিলেন বলে জানা গেছে। ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, ‘এই দুই উমাপতি এক এবং অভিন্ন হওয়া বিচিত্র নয়’ (বাঙালির ইতিহাস, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৭৫৩)।

আরো পড়ুন--  সমাচার দর্পণ 1818

শরণ

দুরূহ ও দ্রুত পদ রচনার ( জয়দেবের ভাষায়, ‘শরণং শ্লাঘ্যে দুরূহ দ্রুতে’ ) ক্ষেত্রে কবি শরণের প্রতিভা ছিল অসামান্য। তাঁর পদবী নিয়ে সংশয় আছে। ‘সদুক্তিকর্ণামৃতে’ শরণদেব, শরণদত্ত, শরণ এবং চিরন্তন শরণ ইত্যাদি নামে বাইশটি কবিতা আছে। আছে কিছু রূপ গোস্বামীর ‘পদ্যাবলী’তে। তাঁর রচিত কবিতা বেশ কঠিন-

পীযুষং বিষমপ্যসূত জলধিঃ কান্তে কঙ্কালস্য চ …

ধোয়ী

কবি ধোয়ীর খ্যাতি ছিল শ্রুতিধর রূপে। তাঁর অন্যতম সৃষ্টি ‘পবনদূত’ কাব্য কালিদাসের ‘মেঘদূত’ অনুসরণে লেখা হয়। বৈদর্ভী রীতিতে লেখা এই কাব্যে যুবরাজ লক্ষ্মণসেনের দাক্ষিণাত্য অভিযান কালে কুবলয়বতী নামে এক গন্ধর্বকন্যার প্রণয় নিবেদন কাহিনী বর্ণিত হয়েছে,

তম্মিন্নেকা কুবলয় বতী নাম গন্ধর্বকন্যা

মন্যে জৈত্র মৃদু কুসমতোহ প্যায়ধুং যা স্মরণ্য। ইত্যাদি

গোবর্ধন আচার্য

গোবর্ধন আচার্যের দক্ষতা ছিল শৃঙ্গার-বিষয়ক পদ রচনায়। আর্যা ছন্দে লেখা তাঁর ‘আর্যাসপ্তশতী’ বাংলার বাইরেও খ্যাতিলাভ করেছিল। আদিরসের প্লাবন থাকলেও পরিহাস ও তির্যকতায় তাঁর রচনা স্বাদু ও উপভোগ্য হয়ে উঠেছে।

আরো পড়ুন--  ভারতী পত্রিকা 1877

জয়দেব

ভাব-ভাষা-বাচনভঙ্গি ছন্দ ব্যবহারে জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দ’ কাব্যের শ্রেষ্ঠত্ব কোন ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। অবক্ষয়ী সংস্কৃত সাহিত্যের যুগে জাত হয়েও কেন তাঁর কবি-ব্যক্তিত্ব এত সম্মানিত, তা সুস্পষ্টভাবে বিশ্লেষণ করেছেন মনীষী সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়-

Jayadeva song not only the swan song of the age which was passing away, but he also sang in the advent of a new age in Indian Literature ‘the vernacular age’. He thus stands at the Juga Sandhi, a confluence of two epochs, with a guiding hand for the new epoch that was coming. Jayadeva can fully be called The Last of the Ancients’ and the First of the Moderns’ in Indian poetry. (Languages and Literatures of Modern India, 1963, p. 160)

অনুরূপভাবে, ষোড়শ শতকের সন্ত কবি নাভাজী দাস তাঁর ‘ভক্তমাল’ বলেছেন,

আরো পড়ুন--  চর্যাপদ-এর টীকাকার মুনিদত্ত [টীকা]

‘জয়দেব কবি নৃপচক্কবৈ, খণ্ড মণ্ডলেশ্বর আণি কবি’ অর্থাৎ কবি জয়দেব হচ্ছেন চক্রবর্তী রাজা, অন্য কবিগণ খণ্ড মণ্ডলেশ্বর মাত্র। (বাঙ্গালীর ইতিহাস)

জয়দেবের কবিতায় ভাবকলা ও রূপকল্প একান্তভাবেই মৌলিক। বাঙালী মনের সঙ্গে সংস্কৃত ভাষা ও মানসিকতার সেতুবন্ধন করে তিনিই প্রথম কাব্য রচনা করলেন। চিরায়ত কৃষ্ণকথাকে রোমান্টিক এবং মানসিক পরিমণ্ডলে স্থাপন করেছেন। তাঁর কবিতা যেমন বৈষ্ণব পদাবলীকে আলোকিত করেছে, তেমনি সহজিয়া সম্প্রদায়, বল্লভাচার্য সম্প্রদায়, শিখদের আদিগ্রন্থ প্রভৃতি নানাবিধ ভক্তি-নির্ভর রচনাশাখাকে বিভাবিত করেছে। অন্যদিকে গীতিকাব্যের অন্যতম পথিকৃৎ রূপে তিনি আধুনিক বাংলা কাব্যে নিত্য স্মরণীয় হয়েছেন মাইকেল মধুসূদন থেকে রবীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু দে প্রমুখ কবিদের কাছে।

Similar Posts

  • আধুনিক-যুগ · পত্র-পত্রিকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    সম্বাদ প্রভাকর 1831

    সম্বাদ প্রভাকর ১৮৩১             সম্পাদক, প্রকাশকাল/আবির্ভাব :  সাপ্তাহিক ‘সম্বাদ প্রভাকর’ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সম্পাদনায় ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দের ২৮শে জানুয়ারি প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে ‘সম্বাদ প্রভাকরে’র মাসিক সংস্করণ প্রকাশিত হয়। শেষ পর্যন্ত ‘সম্বাদ প্রভাকর’ সাপ্তাহিক, মাসিক এবং দৈনিক প্রকাশিত হতে থাকে।   পরিচিতি:  ‘সম্বাদ প্রভাকর’ সপ্তাহে তিনবার প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকা প্রথম…

  • ধর্মমঙ্গল · মঙ্গলকাব্য · মধ্যযুগ · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    রামাই পণ্ডিতের শূন্যপুরাণ

    রামাই পণ্ডিতের ‘শূন্যপুরাণ’  রামাই পণ্ডিতের শূন্যপুরাণ-আলোচনা বাংলা সাহিত্যের ধর্মমঙ্গল কাব্য প্রসঙ্গে হয়ে থাকে। ‘শূন্যপুরাণ’ বিষয়ে এই পোস্টে আলোচিত হবে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে  এর মুল্য রয়েছে। শূন্যপুরাণ সমস্যা রামাই পণ্ডিতের ‘শূন্যপুরাণ’-এর কাল নিয়ে কিছুটা সমস্যা দেখা দিয়েছিল। নগেন্দ্রনাথ বসু, দীনেশচন্দ্র সেন প্রমুখ গবেষকগণ শূন্যপুরাণের ভাষাকে খুব পুরানো বলে মনে করেছিলেন। রামাই পণ্ডিতকে তাঁরা দশম-একাদশ শতকের বলে…

  • সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    কড়চা কী সাহিত্যে কড়চা

    কড়চা   কোন বিষয়ে প্রশ্নের উত্তরে সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রদানকে ‘কড়চা’ বলে। এর আকার অত্যন্ত ক্ষুদ্র। উৎপত্তিগত অর্থ, কা-চা, র-ড;  তুল-পত্রপত্রিকা হতে পর্চা পাতড়া (তথ্য সূত্র : ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’ জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, পৃষ্ঠা ৪১২)। অন্যমতে, কড়চা শব্দটির উৎস সম্ভবত ‘কারিকা’। ‘কারিকা’ অর্থে সংস্কৃত অভিধানে বলা হয়েছে ‘কারিকা বিবরণ শ্লোক’। কারিকাতু স্বল্পবৃত্তে বহোরহস্য সূচনম”। দিনলিপির (diary) আকারে…

  • সূচনা

    প্রাকৃত ও অপভ্রংশ ভাষায় রচিত সাহিত্য

    প্রাকৃত ও অপভ্রংশ ভাষায় রচিত সাহিত্য   প্রাকৃত ও অপভ্রংশ ভাষার সঙ্গে প্রাচীন বাঙালি ও বাংলা সাহিত্যের সম্পর্ক আদৌ দুরত্বের নয়। ভাষাগত দৃষ্টিকোণে ‘প্রাকৃত’ বা ‘অপভ্রংশ’ নামকরণের কারণ, সংস্কৃত বাগভঙ্গী থেকে তার বিচ্যাুতি : ‘Speech fallen off (from the norm) vulgar speech” (Growth of Gujarati Language, M. R. Majumder, Journal of the University of Bombay,…

  • সাহিত্য-টীকা-আধুনিক · কাব্য কবিতা

    অশ্রুকণা ১৮৮৭ খ্রি

    অশ্রুকণা (১৮৮৭ খ্রিঃ) কবি = গিরীন্দ্রমোহিনী দাসী। প্রকৃতি = কাব্যগ্রন্থ (শোককাব্য)। মূল বিষয় = স্বামী ও পুত্র-কন্যাদের নিয়ে পারিবারিক জীবন এবং সেই মধুর জীবনের চিত্রই আলোচা কাব্যের বিষয়। বিশেষ দিক = ‘অশ্রুকণা’ কাব্যে রয়েছে নিঃসঙ্গতা অনুভব। = আলোচ্য কাব্যের অন্তর্গত কবিতাগুলি নির্বাচন করেন অক্ষয় কুমার বড়াল। = কাব্য-সুষমাবর্জিত কবিতাগুলি আধুনিক পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে। =…

  • আধুনিক-যুগ · পত্র-পত্রিকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    সোমপ্রকাশ পত্রিকা 1858

    সোমপ্রকাশ পত্রিকা ১৮৫৮       সোমপ্রকাশ আবির্ভাব :  ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই নভেম্বর এই পত্রিকা সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসাবে প্রথম আত্মপ্রকাশ করে।   পরিচিতি :  দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের সম্পাদনায় সোমপ্রকাশ পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয়। তারপর মোহনলাল বিদ্যাবাগীশের হাতে সম্পাদনার ভার দেন এবং শেষের দিকে তাঁর পুত্র উপেন্দ্রকুমার “নবপর্যায় সোমপ্রকাশ” সম্পাদনা করতেন। মাঝে কাবুলে ব্রিটিশ নীতির বিরুদ্ধাচরণ করার…