ইসলামী বাংলা সাহিত্য মধ্যযুগ সাহিত্য টীকা সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

ইউসুফ জোলেখা কাব্য, শাহ মুহম্মদ সগীর

ইউসুফ জোলেখা কাব্য : মধ্যযুগের ইসালামী সাহিত্যের প্রণয়োপাখ্যান হিসেবে ‘ইউসুফ জোলেখা’ কাব্যটির আবেদন কোনো অংশে কম নয়।

ইউসুফ জোলেখা কাব্য, শাহ মুহম্মদ সগীর

রোমান্টিক প্রণয়ন মূলক কাহিনী কাব্য। 

নায়ক ইউসুফ ও নায়িকা জোলেখার প্রণয় কাহিনী হল কাব্যের উপজীব্য বিষয়। এছাড়া ইউসুফকে লাভ করার জন্য প্রেমিকা জোলেখার আজীবন প্রয়াসের ইতিহাস ও কাহিনীতে বর্ণিত। কাব্যটিতে সুফী তত্ত্বের প্রভাব থাকলেও দুই মর্ত্য মানব মানবীর ( ইউসুফ, জোলেখা)  প্রেমই প্রাধান্য লাভ করেছে। 

ইউসুফ-জোলেখা কাব্যটি শুরু হয়েছে ‘আল্লাহ ও রসুল বন্দনা’, ‘মাতা পিতা ও গুরুজন বন্দনা’, ‘রাজপ্রশস্তি’ ও  ‘পুস্তক রচনার কথা’ দিয়ে। যেমন, ‘আল্লাহ ও রসুল বন্দনা’ অংশে কবি লিখেছেন :

আরো পড়ুন--  আনন্দমঠ 1882, উপন্যাস, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

মোহাম্মদ ছগির দাসকদাস তান। 

তাহা হোহস্ত ‘বাড়’ ভাগ্য মোক নাহি আন।। 

কিংবা,  ‘মাতাপিতা ও গুরুজন বন্দনা’ অংশে কবি জানিয়েছেন, 

ন খাই খাওয়ার পিতা ন পরি পরাএ

কত দুঃখে এক এক বছর গোঞাএ।। 

কাব্যটির বহিরঙ্গে রয়েছে সুখ -দুঃখ, বিরহ – মিলনেট ছবি আর অন্তরঙ্গে উদার সুফিধর্মের ‘ আসীক – মাশোক ’ তও্ব বা জীবাত্মা – পরমাত্মার ভক্তির তত্ত্ব রয়েছে। 

শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রাধা ও কৃষ্ণের মতো জোলেখা ‘ আসীক’ বা জীবাত্মা প্রতীক এবং ইউসুফ ‘মাশোক’ বা  পরমাত্মার প্রতীক। 

চরিত্র চিত্রনের সাগীর কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। ইউসুফের নৈতিকতা বাস্তব বুদ্ধি, প্রলোভন জয় করার ক্ষমতা, ঈশ্বর ভক্তি, পিতৃভক্তি ও ভাতৃস্নেহ ও প্রভূতি বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয় । 

আরো পড়ুন--  কমলাকান্তের দপ্তর 1875

জোলেখা এমন এক চরিত্র যে ধর্মবোধকে স্বীকার করে নিও মানবিক আদর্শে পূর্ণ বিকাশিত হয়েছে। কবি বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবতাবোধ দিয়ে জোলেখা চরিত্রকে চিত্রিত করেছেন। সে সুন্দরী, প্রগলভা,বুদ্ধিমতী, চপলা এবং যুবতী। 

প্রাকৃত ভাষা বা মৈথিলী ভাষার প্রভাবে ষ>খ তে রূপান্তরিত।  যেমন : বিষ >বিখ,নিমেষ>নিমেখ,ঔষধ > ঔখদ, পুরুষ >পুরুখ প্রভুতি। 

এই কাব্য বিভিন্ন রাগের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন – মালসী, ধানসী,ভাটিয়াল,পাটমঞ্জুরী প্রভৃতি। 

পয়ার, এিপদী ছন্দকেই কবি কাব্য বেশি ব্যবহার করেছেন। যেমন : পয়ার ছন্দ—-

পশ্চিম দিকের রাজা / আছিল   প্রাধান। ৮/৬

নৃপতি তৈমুছ নামে /ইন্দ্রের সমান। ৮/৬

  • অলংকার ব্যবহারে কবি সগীর-এর পান্ডিত্য প্রকাশিত হয়েছে। যেমন–
আরো পড়ুন--  বৃন্দাবন দাস, কবি পরিচয়, চৈতন্যভাগবত কাব্যের পরিচয়

    যুগল নয়ন জ্যোতি চন্দ্র সূর্য তুল। 

    জগৎ জিনিআ আঁখি বিশাল বিপুল। 

  • মুহম্মদ সগীর বাইবেল,কোরাণ থেকে কাহিনি চয়ন করলেও বাংলার প্রকৃতি পরিবেশ ও সমাজ বর্ণনায় বাস্তবতার পরিচয় রেখেছেন। 
  • ‘জোলেখার বারমাসী’ অংশে প্রকৃতি ও মানব মনস্তত্ব মিশে গিয়েছে। যেমন, 

নানা বর্ণ ফলবর্গ  জেহেন নক্ষত্র স্বর্গ কনক কটোরা মধুপুর। 

তরুসব সুচরিত  জীবন্ত হরষিত বিরহিণী হেরি কাম ভোর।। 

  • মধ্যযুগের গতানুগতিক দেববাদভিওিক বাংলা সাহিত্য সগীরের ‘ইউসুফ -জোলেখা ’ মানব-মানবীর রোমান্টিক প্রেম কাব্য হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। 

Similar Posts

  • সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    কড়চা কী সাহিত্যে কড়চা

    কড়চা   কোন বিষয়ে প্রশ্নের উত্তরে সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রদানকে ‘কড়চা’ বলে। এর আকার অত্যন্ত ক্ষুদ্র। উৎপত্তিগত অর্থ, কা-চা, র-ড;  তুল-পত্রপত্রিকা হতে পর্চা পাতড়া (তথ্য সূত্র : ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’ জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, পৃষ্ঠা ৪১২)। অন্যমতে, কড়চা শব্দটির উৎস সম্ভবত ‘কারিকা’। ‘কারিকা’ অর্থে সংস্কৃত অভিধানে বলা হয়েছে ‘কারিকা বিবরণ শ্লোক’। কারিকাতু স্বল্পবৃত্তে বহোরহস্য সূচনম”। দিনলিপির (diary) আকারে…

  • সাহিত্য-টীকা-প্রাচীন · সূচনা

    রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজসভায় সাহিত্যচর্চা

    রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজসভায় সাহিত্যচর্চা লক্ষ্মণসেনের রাজসভায় ‘পঞ্চরত্ন’-এর সমাবেশ ঘটেছিল; এঁরা হলেন কবি জয়দেব, উমাপতি ধর, শরণ, ধোয়ী, গোবর্ধন আচার্য। জয়দেবের গীতগোবিন্দে’র প্রশস্তি-শ্লোক, সুভাষিতাবলীর (১৫শ শতাব্দী) শ্লোক এবং ‘বৈষণবতাষণী’ টীকা-গ্রন্থের সাক্ষ্যে মনে হয়, এঁরা ছিলেন সমসাময়িক। জয়দেবের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন স্বরাজ্যে সম্রাট। উমাপতি ধর উমাপতি ধরের কাব্যকলার পরিচয় বহন করছে দেওপাড়া এবং মাধাই…

  • সাহিত্য-টীকা-আধুনিক · কাব্য কবিতা

    অগ্নিবীণা ১৯২২ খ্রি.

    অগ্নিবীণা (১৯২২ খ্রি.) কবি = কাজী নজরুল ইসলাম। প্রকৃতি = কাব্যগ্রন্থ। মূল বিষয় = বিংশ শতকের প্রথম দুই দশকে ভারতবর্ষে নতুন জীবন, নতুন সম্ভাবনার অভিব্যক্তি ও দেশাত্মবোধ এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলিতে প্রকাশিত। বৈশিষ্ট্য ও বিশেষ কথা = ‘অগ্নিবীণা’ নজরুলের প্রথম ও প্রধান কাব্যগ্রন্থ। = নজরুলের বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা এই কাব্যের অন্তর্গত। = গ্রন্থটিতে মোট বারটি (১২টি)…

  • আধুনিক-যুগ · পত্র-পত্রিকা · সাহিত্য টীকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    সমাচার দর্পণ 1818

    সমাচার দর্পণ 1818 [১৮১৮] সমাচার দর্পণ 1818 এর প্রকাশকাল বা আবির্ভাব ১৮১৮ সালের ২৩শে মে। ‘সমাচার দর্পণ’ প্রকাশ ও বিবর্তনের একটা দীর্ঘ ইতিহাস আছে। ১৭৯৯ সালের মে মাসে লর্ড ওয়েলেসলি সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ আইন প্রকাশ করেন। ১৯ বছর পর ১৮১৮ সালে লর্ড হেস্টিংস এই আইনটি তুলে দেন। এই সময়ই ‘সমাচার দর্পণ’ প্রকাশিত হয়। সমাচার দর্পণ 1818…

  • অনুবাদ-সাহিত্য · মধ্যযুগ · রামায়ণ-অনুবাদ

    কবি কৃত্তিবাসের সময়কাল কবি কৃত্তিবাসের আত্মবিবরণ

    কবি কৃত্তিবাসের সময়কাল কবি কৃত্তিবাসের আত্মবিবরণ       রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিখ্যাত “সেকাল” কবিতায় লিখেছিলেন:   “হায়রে কবে কেটে গেছে কালিদাসের কাল পণ্ডিতেরা বিবাদ করে লয়ে তারিখ সাল।”       কৃত্তিবাসের কবি-মহিমা স্মরণ করে একথা পাঠকেরও মনে হতে পারে। রামায়ণ পাঁচালীর অমর কবি কৃত্তিবাস যথার্থই বাংলা দেশের ‘কীর্তিবাস’। কিন্তু রাজমহল থেকে চট্টগ্রাম এবং উড়িষ্যার…

  • আধুনিক-যুগ · পত্র-পত্রিকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    ভারতী পত্রিকা 1877

    ভারতী পত্রিকা ১৮৭৭   আবির্ভাব ১৮৭৭ সালের জুলাই মাসে (১২৮৪ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসে) ‘ভারতী’ পত্রিকার প্রথম আবির্ভাব। পরিচিতি এই পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তবে এই ‘ভারতী’ পত্রিকা প্রকাশের পেছনে যাঁর অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি ছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই পত্রিকা মূলত ছিল ঠাকুরবাড়ির পত্রিকা। প্রায় অর্ধশত বৎসর এই পত্রিকা চালু ছিল। ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের কার্তিক…