ইসলামী বাংলা সাহিত্য মধ্যযুগ সাহিত্য টীকা সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

ইউসুফ জোলেখা কাব্য, শাহ মুহম্মদ সগীর

ইউসুফ জোলেখা কাব্য : মধ্যযুগের ইসালামী সাহিত্যের প্রণয়োপাখ্যান হিসেবে ‘ইউসুফ জোলেখা’ কাব্যটির আবেদন কোনো অংশে কম নয়।

ইউসুফ জোলেখা কাব্য, শাহ মুহম্মদ সগীর

রোমান্টিক প্রণয়ন মূলক কাহিনী কাব্য। 

নায়ক ইউসুফ ও নায়িকা জোলেখার প্রণয় কাহিনী হল কাব্যের উপজীব্য বিষয়। এছাড়া ইউসুফকে লাভ করার জন্য প্রেমিকা জোলেখার আজীবন প্রয়াসের ইতিহাস ও কাহিনীতে বর্ণিত। কাব্যটিতে সুফী তত্ত্বের প্রভাব থাকলেও দুই মর্ত্য মানব মানবীর ( ইউসুফ, জোলেখা)  প্রেমই প্রাধান্য লাভ করেছে। 

ইউসুফ-জোলেখা কাব্যটি শুরু হয়েছে ‘আল্লাহ ও রসুল বন্দনা’, ‘মাতা পিতা ও গুরুজন বন্দনা’, ‘রাজপ্রশস্তি’ ও  ‘পুস্তক রচনার কথা’ দিয়ে। যেমন, ‘আল্লাহ ও রসুল বন্দনা’ অংশে কবি লিখেছেন :

আরো পড়ুন--  কমলাকান্তের দপ্তর 1875

মোহাম্মদ ছগির দাসকদাস তান। 

তাহা হোহস্ত ‘বাড়’ ভাগ্য মোক নাহি আন।। 

কিংবা,  ‘মাতাপিতা ও গুরুজন বন্দনা’ অংশে কবি জানিয়েছেন, 

ন খাই খাওয়ার পিতা ন পরি পরাএ

কত দুঃখে এক এক বছর গোঞাএ।। 

কাব্যটির বহিরঙ্গে রয়েছে সুখ -দুঃখ, বিরহ – মিলনেট ছবি আর অন্তরঙ্গে উদার সুফিধর্মের ‘ আসীক – মাশোক ’ তও্ব বা জীবাত্মা – পরমাত্মার ভক্তির তত্ত্ব রয়েছে। 

শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের রাধা ও কৃষ্ণের মতো জোলেখা ‘ আসীক’ বা জীবাত্মা প্রতীক এবং ইউসুফ ‘মাশোক’ বা  পরমাত্মার প্রতীক। 

চরিত্র চিত্রনের সাগীর কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। ইউসুফের নৈতিকতা বাস্তব বুদ্ধি, প্রলোভন জয় করার ক্ষমতা, ঈশ্বর ভক্তি, পিতৃভক্তি ও ভাতৃস্নেহ ও প্রভূতি বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয় । 

আরো পড়ুন--  কবি কৃত্তিবাসের সময়কাল কবি কৃত্তিবাসের আত্মবিবরণ

জোলেখা এমন এক চরিত্র যে ধর্মবোধকে স্বীকার করে নিও মানবিক আদর্শে পূর্ণ বিকাশিত হয়েছে। কবি বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবতাবোধ দিয়ে জোলেখা চরিত্রকে চিত্রিত করেছেন। সে সুন্দরী, প্রগলভা,বুদ্ধিমতী, চপলা এবং যুবতী। 

প্রাকৃত ভাষা বা মৈথিলী ভাষার প্রভাবে ষ>খ তে রূপান্তরিত।  যেমন : বিষ >বিখ,নিমেষ>নিমেখ,ঔষধ > ঔখদ, পুরুষ >পুরুখ প্রভুতি। 

এই কাব্য বিভিন্ন রাগের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন – মালসী, ধানসী,ভাটিয়াল,পাটমঞ্জুরী প্রভৃতি। 

পয়ার, এিপদী ছন্দকেই কবি কাব্য বেশি ব্যবহার করেছেন। যেমন : পয়ার ছন্দ—-

পশ্চিম দিকের রাজা / আছিল   প্রাধান। ৮/৬

নৃপতি তৈমুছ নামে /ইন্দ্রের সমান। ৮/৬

  • অলংকার ব্যবহারে কবি সগীর-এর পান্ডিত্য প্রকাশিত হয়েছে। যেমন–
আরো পড়ুন--  তুর্কি আক্রমণ, বাংলা সাহিত্যে তার প্রভাব

    যুগল নয়ন জ্যোতি চন্দ্র সূর্য তুল। 

    জগৎ জিনিআ আঁখি বিশাল বিপুল। 

  • মুহম্মদ সগীর বাইবেল,কোরাণ থেকে কাহিনি চয়ন করলেও বাংলার প্রকৃতি পরিবেশ ও সমাজ বর্ণনায় বাস্তবতার পরিচয় রেখেছেন। 
  • ‘জোলেখার বারমাসী’ অংশে প্রকৃতি ও মানব মনস্তত্ব মিশে গিয়েছে। যেমন, 

নানা বর্ণ ফলবর্গ  জেহেন নক্ষত্র স্বর্গ কনক কটোরা মধুপুর। 

তরুসব সুচরিত  জীবন্ত হরষিত বিরহিণী হেরি কাম ভোর।। 

  • মধ্যযুগের গতানুগতিক দেববাদভিওিক বাংলা সাহিত্য সগীরের ‘ইউসুফ -জোলেখা ’ মানব-মানবীর রোমান্টিক প্রেম কাব্য হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। 

Similar Posts

  • বিদ্যাপতি

    বিদ্যাপতির জীবন ইতিহাস, Best unique 7 points

    মৈথিল কোকিল বিদ্যাপতির জীবনের নানাদিক নিয়ে এই লেখাটি প্রস্তুত করা হয়েছে। বৈষ্ণব সাহিত্যের শিরোমণি বিদ্যাপতির ব্যক্তিগত জীবনের যতখানি তথ্য এখন জানা সম্ভব তা সংক্ষেপে এখানে উল্লিখিত হল। বিদ্যাপতির জীবন ইতিহাস শুরুর কথা মিথিলার কবি হওয়া সত্ত্বেও বিদ্যাপতি বাঙালির জীবন ও সাধনার সঙ্গে গভীর আত্মীয়তার সূত্রে আবদ্ধ। বিদ্যাপতিকে বাঙালি পরম শ্রদ্ধা-সহকারে বরণ করে নিয়েছে। তাঁর কবিতাবলীর…

  • আধুনিক-যুগ · নাটক প্রহসন · সাহিত্য টীকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    আলালের ঘরের দুলাল 1858, প্যারীচাঁদ মিত্র 

    আলালের ঘরের দুলাল 1858 : প্যারিচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল নামক নকশাধর্মী রচনাটি অনেকক্ষেত্রেই বাংলায় রচিত প্রথম উপন্যাস হিসেবে পরিগণিত হয়। যদিও সার্থক উপন্যাস হিসেবে এটিকে গ্রহণ করা যায় না। আলালের ঘরের দুলাল 1858 (১৮৫৮ খ্রি:), প্যারীচাঁদ মিত্র  বিভিন্ন পরিচয় বিষয়বস্তু বিশেষত্ব ভাষারীতির নমুনা “ বাবুরাম বাবু চৌগোপপা – নাকে তিলক– কস্তা পেরে ধুতি পরা –…

  • আধুনিক-যুগ · পত্র-পত্রিকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    সমাচার চন্দ্রিকা 1822

    সমাচার চন্দ্রিকা ১৮২২   প্রকাশকাল/আবির্ভাব রামমোহনের হিন্দুধর্ম ও সমাজ সম্বন্ধে অতিশয় আধুনিক ও প্রগতিশীল মতের সঙ্গে কিছু রক্ষণশীল স্বভাব ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাল মিলিয়ে চলতে না পারার ফলে দু’জনের মতভেদ হয়ে গেল। রামমোহনের সঙ্গ এবং ‘সম্বাদ কৌমুদী’র সংস্পর্শ ত্যাগ করে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮২২ সালে ‘সমাচার চন্দ্রিকা নামে সুপ্রসিদ্ধ পত্রিকা বার করেন।  আরো পড়ুন–  জাগরণ পালা, সাহিত্য টীকাসম্পাদক/পরিচিতি…

  • সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ · রামায়ণ-অনুবাদ

    অদ্ভুত রামায়ণ

    অদ্ভুত রামায়ণ কবি = অদ্ভুত আচার্য। প্রকৃতি = অনুবাদ জাতীয়। বিশেষ কথা = রামায়ণের সাতকাণ্ডের ভাবানুবাদ করেছিলেন কবি। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে রজনীকান্ত চক্রবর্তীর সম্পাদনায় রংপুর সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত হয়। বৈশিষ্ট্য ++ তাঁর কাব্য কৃত্তিবাসের কাব্য অপেক্ষা বৃহদায়তন। ++ পয়ার, ত্রিপদী ছন্দ ও আধুনিক শব্দের প্রচুর প্রয়োগে কাব্যটি উল্লেখযোগ্য। যেমন, রামের বনগমনে কৌশল্যার বিলাপ “আমাকে ছাড়িয়া…

  • মঙ্গলকাব্য · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    বারমাস্যা বা বারমাসী

    বারমাস্যা বা বারমাসী   ‘বারমাস্যা’ বা ‘বারমাসী’ কথাটির অর্থ বারো মাস, অর্থাৎ একটা গোটা বৎসরের বিবরণ। প্রাচীন সাহিত্য বা মধ্যযুগের বাংলা কাব্যে লৌকিক কাহিনী বর্ণনায় নায়ক-নায়িকার বারো মাসের সুখ-দুঃখের বিবরণ আছে। মঙ্গলকাব্যে এটি এক বিশেষ লক্ষণ বা রীতি হয়ে উঠেছে। ‘বারমাসী’ কবিতাগুলির বৈশিষ্ট্য হল : (১) বারো মাস এবং ছয় ঋতুর আবর্তনের মধ্য দিয়ে মানবচিত্তের…

  • অন্যান্য-বৈষ্ণবসাহিত্য · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    উজ্জ্বলনীলমণি, শ্রীরূপ গোস্বামী

    উজ্জ্বলনীলমণি, শ্রীরূপ গোস্বামী শ্রীরূপ গোস্বামীর লিখিত সাহিত্যের উজ্জ্বল নিদর্শন হল ‘উজ্জ্বলনীলমণি’। বৃন্দাবনের ষড়গোস্বামীদের মধ্যে জ্ঞানী ও ভক্ত রূপ গোস্বামী তাঁর এই গ্রন্থে বৈষ্ণব রসতত্ত্বের নানান দিক আলোচনা করেছেন— যা বৈষ্ণব সমাজে বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। ‘উজ্জ্বলনীলমণি’-তে পাঁচটি মুখ্যরসের প্রধানতম যে রস শৃঙ্গার, মধুর বা উজ্জ্বল রস – তাকে অধ্যাত্ম ব্যঞ্জনার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। ‘ভক্তিরসামৃতসিন্ধু’-তে বৈষ্ণব…