অন্নদামঙ্গল মঙ্গলকাব্য মধ্যযুগ

ভারতচন্দ্রের রচনাবলী

ভারতচন্দ্রের রচনাবলী

 

বাংলা সাহিত্যে ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর অতিপরিচিত কবি, অন্নদামঙ্গল কাব্যের একক রচয়িতা। তাঁর যেসব ভণিতা আমরা পাই তা হল—‘কবি রায়গুণাকর’, ‘দ্বিজ ভারত’, ‘ভারত ব্রাহ্মণ’ ইত্যাদি। তাঁর নামে প্রচলিত রচনাবলীর পরিচয় উল্লিখিত হল।

সত্যপীরের কথা

 

কবির প্রথম রচনা দুটি হল সত্যপীরের পাঁচালি। একটি ত্রিপদী ছন্দে রচিত [এটির রচনাকাল জানা যায় না], অন্যটি চৌপদী ছন্দে রচিত [১৭৩৭–৩৮ খ্রি.এর মধ্যে]। প্রথমটির কোন পুথি পাওয়া যায় না, দ্বিতীয়টির একটিমাত্র পুথি পাওয়া যায়। এগুলি রচনার সময় কবি দেবানন্দপুরে বাস করতেন।

পরিকল্পিত দেবতা সত্যপীরের দয়া–দাক্ষিণ্যের পরিচয় গল্প আকারে বিধৃত হয়েছে।দু–তিনটি গল্পকে কেন্দ্র করে এই পাঁচালি গড়ে উঠেছে। বিষয়বস্তু ইত্যাদিতে কবির মৌলিকতা কিছুই নেই। কবির অল্প বয়সের রচনা।
কাব্যের শেষাংশে কবির বংশ পরিচয় বিধৃত হয়েছে।রচনাটির গুরুত্ব এখানেই।

রসমঞ্জরী

 

আরো পড়ুন--  শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য পৌরাণিক প্রভাব
বিবিধ অলংকার গ্রন্থের ছায়ায় নায়ক–নায়িকার লক্ষণ ও বিবিধ অবস্থার বর্ণনা সংক্রান্ত রচনা হল রসমঞ্জরী। এর কোনো পুথি পাওয়া যায় না। রচনাকাল আনুমানিক ১৭৪০ খ্রি.। আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন ভানুদত্ত মিশ্রের ‘রসমঞ্জরী’।রসমঞ্জরীর মুল বিষয়—

ক। নায়িকা প্রকরণ খ। নায়িকা সহায় গ। নায়ক প্রকরণ ঘ। নায়ক সহায় ঙ। শৃঙ্গার নিরূপন চ। ভাব প্রকরণ ছ। বয়োবিভাগ জ। জাতিকথন।

অন্নদামঙ্গল (অন্নপূর্ণামঙ্গল)

 

কৃষ্ণচন্দ্রের আদেশে তাঁর বনশের কীর্তি–কথা অবলম্বনে ভারতচন্দ্র এই মঙ্গলকাব্য রচনা করেছেন। কাব্যের রচনাকাল জ্ঞাপক শ্লোক—

বেদ লয়ে ঋষি রসে ব্রহ্ম নিরুপিলা।
সেই শকে এই গীত ভারত রচিলা।।

—অর্থাৎ ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দ।

কাব্যটি ৩ খণ্ডে বিভক্ত— ১.অন্নপূর্ণামঙ্গল ২. বিদ্যাসুন্দর (কালিকামঙ্গল) ৩. মানসিংহ

সমগ্র অন্নদামঙ্গল কাব্যের প্রাচীন নির্ভরযোগ্য পুথি পাওয়া যায় না। পুরোনো যা পাওয়া গেছে তা সবই বিদ্যাসুন্দরের। অন্নদামঙ্গল সর্বপ্রথম মুদ্রিত হয় ১৮১৬ সালে তিন খণ্ডে [গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য দ্বারা]। এরপর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রকাশ করেন ১৮৪৭ ও ১৮৫৩ তে। অনেকে বিদ্যাসাগর–কৃত সংস্করণকে আদর্শ বলে মন্রে করেন।

বিবিধ কবিতাবলী

 

আরো পড়ুন--  বৃন্দাবন দাস, কবি পরিচয়, চৈতন্যভাগবত কাব্যের পরিচয়
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের লেখা ‘কবিবর ভারতচন্দ্র রায় গুণাকরের জীবন বৃত্তান্ত’ নামের লেখায় ভারতচন্দ্রের ১২ গীতের উল্লেখ রয়েছে। এগুলির পুথি কিংবা রচনাকাল অজ্ঞাত।

পত্রম্‌

 

মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে লেখা একটি পত্র ভারতচন্দ্র বিরচিত বলে পাওয়া যায়। পত্রটি সংস্কৃতে রচিত এবং বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ গ্রন্থাগারে এটি রক্ষিত রয়েছে। পত্রটি সাল–তারিখ ছাড়াই রচিত।

নাগাষ্টকম্‌

 

রচনাকাল আনুমানিক ১৭৪৫–৫০ খ্রি। কাব্যটির কোনো পুথি পাওয়া যায় না। কাব্যটি সংস্কৃতে রচিত। বঙ্গানুবাদে যা পাওয়া যায় তা কবি–কৃত নয় বলেই মনে হয়।

চন্ডীনাটক

 

আরো পড়ুন--  গঙ্গারামের মহারাষ্ট্র পুরাণ
অসমাপ্ত ও সংস্কৃত ভাষায় রচিত। মার্কন্ডেয় পুরাণের [৮২–৮৩ অধ্যায়]অনুসরণে এই নাটকটি রচিত। কোনো পুথি পাওয়া যায় না। রচনাকাল আনুমানিক ১৭৫০–এর পর। নাটকের বিষয় দেবী চন্ডীর মহিষাসুর দমন।

গঙ্গাষ্টকম্‌

 

সংস্কৃত ভাষায় রচিত গঙ্গাস্তোত্র। রচনাটির কোনো পুথি পাওয়া যায় না, এটির রচনাকালও জানা যায় না।
      
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 

Similar Posts

  • অন্যান্য-বৈষ্ণবসাহিত্য · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    উজ্জ্বলনীলমণি, শ্রীরূপ গোস্বামী

    উজ্জ্বলনীলমণি, শ্রীরূপ গোস্বামী শ্রীরূপ গোস্বামীর লিখিত সাহিত্যের উজ্জ্বল নিদর্শন হল ‘উজ্জ্বলনীলমণি’। বৃন্দাবনের ষড়গোস্বামীদের মধ্যে জ্ঞানী ও ভক্ত রূপ গোস্বামী তাঁর এই গ্রন্থে বৈষ্ণব রসতত্ত্বের নানান দিক আলোচনা করেছেন— যা বৈষ্ণব সমাজে বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। ‘উজ্জ্বলনীলমণি’-তে পাঁচটি মুখ্যরসের প্রধানতম যে রস শৃঙ্গার, মধুর বা উজ্জ্বল রস – তাকে অধ্যাত্ম ব্যঞ্জনার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। ‘ভক্তিরসামৃতসিন্ধু’-তে বৈষ্ণব…

  • অন্যান্য-বৈষ্ণবসাহিত্য

    অষ্টাদশ শতাব্দীর বৈষ্ণব পদ সংকলন গ্রন্থ

    বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের (প্রাগাধুনিক পর্যায়) বৈষ্ণব সাহিত্যের আলোচনায় বৈষ্ণবপদ সংকলন গ্রন্থের প্রসঙ্গ আলোচনা অবশ্য কর্তব্য। এই লেখায় উল্লেখযোগ্য পদসংকলন গ্রন্থের সাধারণ আলোচনার পাশাপাশি অপ্রধান কিছু সংকলন গ্রন্থের আলোচনাও সংযোজিত হয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর বৈষ্ণব পদ সংকলন গ্রন্থ সাধারণ আলোচনা মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের প্রচারিত বৈষ্ণবীয় প্রেমধর্মের প্রভাবে বাংলার রাষ্ট্র ও সমাজজীবনে এবং বাংলা সাহিত্যে বিরাট এক পরিবর্তন সূচিত…

  • মঙ্গলকাব্য · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    বারমাস্যা বা বারমাসী

    বারমাস্যা বা বারমাসী   ‘বারমাস্যা’ বা ‘বারমাসী’ কথাটির অর্থ বারো মাস, অর্থাৎ একটা গোটা বৎসরের বিবরণ। প্রাচীন সাহিত্য বা মধ্যযুগের বাংলা কাব্যে লৌকিক কাহিনী বর্ণনায় নায়ক-নায়িকার বারো মাসের সুখ-দুঃখের বিবরণ আছে। মঙ্গলকাব্যে এটি এক বিশেষ লক্ষণ বা রীতি হয়ে উঠেছে। ‘বারমাসী’ কবিতাগুলির বৈশিষ্ট্য হল : (১) বারো মাস এবং ছয় ঋতুর আবর্তনের মধ্য দিয়ে মানবচিত্তের…

  • বিদ্যাপতি

    কবি বিদ্যাপতি ও ব্রজবুলি ভাষা

    কবি বিদ্যাপতি ও ব্রজবুলি ভাষা ভূমিকা বিদ্যাপতির পদাবলীতে ব্যবহৃত কাব্যভাষা সম্পর্কে গবেষণা করতে গিয়ে পণ্ডিতরা স্থির করেছেন যে, বিদ্যাপতির ভাষা ব্রজবুলি। তবে বিদ্যাপতি ব্রজবুলি ভাষায় পদ রচনা করেছিলেন কিনা– এ সম্পর্কে পণ্ডিতেরা স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেননি। অনেকের মতে বিদ্যাপতি মৈথিলী ভাষার মূল পদাবলী রচনা করেছিলেন। পরে তার পদ ব্রজবুলিতে রূপান্তরিত হয়েছে। বিদ্যাপতি বহু ভাষাবিদ…

  • বিদ্যাপতি

    বিদ্যাপতির জীবন ইতিহাস, Best unique 7 points

    মৈথিল কোকিল বিদ্যাপতির জীবনের নানাদিক নিয়ে এই লেখাটি প্রস্তুত করা হয়েছে। বৈষ্ণব সাহিত্যের শিরোমণি বিদ্যাপতির ব্যক্তিগত জীবনের যতখানি তথ্য এখন জানা সম্ভব তা সংক্ষেপে এখানে উল্লিখিত হল। বিদ্যাপতির জীবন ইতিহাস শুরুর কথা মিথিলার কবি হওয়া সত্ত্বেও বিদ্যাপতি বাঙালির জীবন ও সাধনার সঙ্গে গভীর আত্মীয়তার সূত্রে আবদ্ধ। বিদ্যাপতিকে বাঙালি পরম শ্রদ্ধা-সহকারে বরণ করে নিয়েছে। তাঁর কবিতাবলীর…

  • অন্যান্য-বৈষ্ণবসাহিত্য · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    ভক্তিরসামৃতসিন্ধু, শ্রীরূপ গোস্বামী

    ভক্তিরসামৃতসিন্ধু   শ্রীচৈতন্যের স্নেহধন্য শ্রীরূপ গোস্বামী (হুসেন শাহের কর্মচারী দবীর খাস)-র বৈষ্ণব রসশাস্ত্র সম্পর্কিত বিখ্যাত গ্রন্থ হল ‘ভক্তিরসামৃতসিন্ধু’। এই গ্রন্থ প্রমাণ করে, শ্রীরূপ ছিলেন একজন বিশিষ্ট কবি ও রসশাস্ত্রের বোদ্ধা। তাঁর এই গ্রন্থের দ্বারা বৈষ্ণব সমাজ তো বটেই, সেইসঙ্গে সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীর বৈষ্ণব পদকর্তারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। জীব গোস্বামী এই গ্রন্থের টীকা রচনা করে নাম দেন ‘দুর্গমসঙ্গমণি’।…