মধ্যযুগ সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

গঙ্গারামের মহারাষ্ট্র পুরাণ

গঙ্গারামের মহারাষ্ট্র পুরাণ : প্রাগাধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক কাব্য বলতে যা বোঝায়, এই কাব্য কতকটা সেইরকম।

গঙ্গারামের মহারাষ্ট্রপুরাণ 

চৈতন্যচরিত সাহিত্যে তথ্যাশ্রয়ী যুগ-বীক্ষণের সূচনা হয়। কাব্যের মধ্যে সমকালীন ইতিহাসের প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল তবু তা পূর্ণরূপ নয় পদক্ষেপ, পূর্ণাঙ্গ, কাহিনীর আশ্রয়ে নয়, অনুসঙ্গী ও সহায়িকার রূপে তা স্থান পায়। সেই রূঢ় বাস্তবের তাপ ও ইতিহাসের উত্তাপ পূর্ণভাবে পাওয়া গেল যে-গ্রন্থে, তার নাম ‘মহারাষ্ট্রপুরাণ’ বা ‘ভাস্কর পরাভব’, বিষয়—মারাঠা অধিপতি সাহু (রঘুজী ভৌসলা) সহচর ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে বাংলাদেশের বুকে বর্গীসেনার ভয়াবহ অত্যাচার বর্ণনা। কবির নাম, গঙ্গারাম বা গঙ্গানারায়ণ দেব।

গঙ্গারামের মহারাষ্ট্র পুরাণ-এর আবিষ্কার

বাংলা ১৩১১ বঙ্গাব্দে মৈমনসিংহের কৃষিশিল্প প্রদর্শনীতে ‘সৌরভ’ সম্পাদক কেদারনাথ মজুমদার এই কাব্যের পুঁথি সম্পর্কে প্রথম পরিচয় দেন। তারপর দেন ব্যোমকেশ মুস্তাফী। কেদারনাথের প্রদত্ত তথ্য থেকে জানা যায়, অষ্টাদশ শতকের প্রারম্ভে কিশোরগঞ্জ মহকুমার অন্তর্ভুক্ত ধরীশ্বর গ্রামে কবির জন্ম হয়। তাঁর কৌলিক উপাধি দের (প্রপিতামহের নাম হরিশ্বর দেব), কিন্তু জঙ্গলবাড়ীর মুসলমান জমিদারের সেরেস্তার উচ্চপদাধিকারী কর্মচারীরূপে উপাধি পান ‘চৌধুরী’। পরে জমিদারের সঙ্গে মতান্তরের জন্য কাজ ত্যাগ করেন। কিন্তু ব্যোমকেশ মুস্তাফীর মতে, কবি গঙ্গারাম রাঢ়বাসী। অন্যদিকে অধ্যাপক রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় যশোহর নড়াইলের এক অখ্যাত কবি গঙ্গারাম দত্তকে মহারাষ্ট্রপুরাণের রচয়িতারূপে স্বীকৃতদানে উৎসুক হন। কিন্তু যথেষ্ট যুক্তির অভাবে এঁদের কারোরই দাবী অভ্রান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।

আরো পড়ুন--  বৃন্দাবন দাস, কবি পরিচয়, চৈতন্যভাগবত কাব্যের পরিচয়

কাব্যের রচনাকাল

কাব্যটির একটি অন্যতম বিশেষত্ব, গ্রন্থের রচনাকাল নির্দেশে রচয়িতার স্পষ্ট ও পরিচ্ছন্ন মনোভঙ্গি—

বৈশাখের উনিশায়         বর্গী আইলা তায়

             মহা আনন্দিত হৈয়া মনে।

১৭৫১ খ্রীস্টাব্দে ১৯শে বৈশাখ (১১৪৯ বঙ্গাব্দ)—“ইতি মহারাষ্ট্রপুরাণে প্রথম কাণ্ডে ভাস্করপরাভব শকাব্দ ১৬৭২ সন ১১৫৮ সাল তারিখ ১৪ই পৌষ রোজ শনিবার” (ক বি. পুথি) অর্থাৎ এই কাব্য ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দে রচিত হয়। বাংলাদেশে বর্গীর উৎপাতের সময়সীমা ১৭৪২ থেকে ১৭৪৯ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত; অভিযান হয় তিনবার–১৭৪২, ১৭৪৩, ১৭৪৪ খ্রীস্টাব্দ। বাংলাদেশের মসনদে তখন অধিষ্ঠিত হৃতসম্বল সুলতান আলিবর্দি। অপমানিত ও লাঞ্ছিত সুলতান দেওয়ান জানকীরাম ও সিপাহশালার মুস্তাফা খাঁর সহযোগিতায় সুকৌশলে নিরস্ত্র অবস্থায় ভাস্কর পণ্ডিত ও তাঁর অনুচরদের ডেকে এনে গুপ্তভাবে হত্যা করেন। 

আরো পড়ুন--  তুর্কি আক্রমণ, বাংলা সাহিত্যে তার প্রভাব

কাব্যটির প্রথম কাণ্ডের নাম ‘ভাস্কর পরাভব’। পুথিগত সাক্ষ্যের অভাবে অন্য কাণ্ড আর লেখা হয়নি বলেই অনুমান। কাহিনীর বহিরঙ্গে পুরাণের ছদ্মবেশে—পৃথিবীতে অবিচার অত্যাচার দেখে ক্লিষ্টা পৃথিবীকে সঙ্গে করে ব্রহ্মার শিবের কাছে আগমন হয়। শিবের নির্দেশে তাঁর অনুচর নন্দী মারাঠা-রাজ সাথকে অত্যাচার দমনে আদেশ দেন (প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গলেও পাওয়া যায়, অনুরূপ বিবরণ)। কিন্তু অনুচর ভাস্কর পণ্ডিতের বর্গী (বা বার্গীর) সেনাদলের ব্রাহ্মণ ও নারীদের উপর নৃশংস অত্যাচার দেখে দেবী পার্বতী ভৈরবীদের নির্দেশ দেন—”ভাস্করকে বাম হইয়া নবাবকে সদয় হবি”।

বর্গীদের অত্যাচার বর্ণনা

‘মহারাষ্ট্রপুরাণে’র মুখ্য লক্ষ্য হল ইতিহাস বর্ণনা। ঘুমন্ত ব্রতকথার মতো শান্ত পল্লীবাংলার জনমানসে বর্গীর নামে নেমেছিল আতঙ্কের ধস্, গ্রামে-গঞ্জে-কুটিরে জ্বলে উঠেছিল যে অত্যাচারের দাবানল, ছড়াকারদের রচনায় ছড়িয়েছিল যার রেশ—তাকেই কবির সমকালের ঐতিহাসিকের মতো দায়িত্ব নিয়ে অনুপুঙ্খ তথ্যচেতনায় এবং নির্লিপ্ত-ভঙ্গীতে প্রকাশ করেন।

ভাল ভাল স্ত্রীলোক যত ধইরা লইয়া যাএ

অঙ্গুষ্ঠে দড়ি বেঁধে দেয় তার গলাএ।

একজনে ছাড়ে তারে অন্যজনা ধরে।

রমণের ডরে ত্রাহি শব্দ করে।।

এই যদি হয় নারী-নিগ্রহের বিবরণ, তবে অন্যের ক্ষেত্রে,

কাহুকে বাঁধে বরগী দিআ পিঠমোড়া।

চিত কইরা মারে লাথি পাত্র জুতা চড়া।।

এই বর্ণনার ভঙ্গী গদ্যাত্মক, ওড়িয়া কবি ব্রজনাথ বড়জেনার ‘সমরতরঙ্গ’এর মতো কাব্যিক নয়। তবু এ বিবরণের উৎস যে রাজকর্মচারী গঙ্গারামের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাজনিত ফলশ্রুতি, তা কোন ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। একথা ঠিক, কাব্যরসিকের আগ্রহ এ গ্রন্থ মেটায় না, একালের সতর্ক ইতিহাস পাঠকও দু-একটি তথ্যচ্যুতি হয়ত খুঁজে পাবেন, তবু মহারাষ্ট্রপুরাণে’র প্রত্যক্ষদ্রষ্টা স্রষ্টাকে সাধুবাদ জানাতে হয়।

আরো পড়ুন--  রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজসভায় সাহিত্যচর্চা

Similar Posts

  • চৈতন্য-চরিত-সাহিত্য · মধ্যযুগ · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    ভক্তিরত্নাকর, নরহরি চক্রবর্তী

    ভক্তিরত্নাকর | নরহরি চক্রবর্তী   দুই নামে একই ব্যক্তি বৈষ্ণবধর্মের সমাজ ও সংস্কৃতির ঐতিহাসিক উপাদান গ্রন্থরূপে ভক্তিবাকর এক স্মরণীয় রচনা। পঞ্চাদশ তরঙ্গে বিভক্ত এই গ্রন্থের বিষয় ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ পর্যন্ত দু’শ বছরের বৈষ্ণব সমাজ ও সম্প্রদায়ের বিবরণদান। তার মধ্যে আবার পঞ্চম তরঙ্গে আছে মার্গ সঙ্গীতের বিশেষ উপস্থাপনা। গ্রন্থকার নরহরি চক্রবর্তী ও ঘনশ্যাম দাস নামে একই…

  • মহাভারত অনুবাদ · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

     কাশীদাসী মহাভারত 

     কাশীদাসী মহাভারত : সংস্কৃত ভাষায় রচিত মহাভারত মহাকাব্যের বাংলায় অনুবাদ করার প্রথম সফল চেষ্টা লক্ষ করা যায় কাশিরাম দাসের কাব্যে অর্থাৎ ‘ভারত পাঁচালি’তে।  কাশীদাসী মহাভারত  জীবনী কাশীরামের  নিজের দেওয়া তথ্য এবং অন্যান্য তথ্যাদি থেকে তার ব্যক্তি পরিচয় জানা যায়। কাশীরাম দাস এর জন্ম বর্ধমানের ইন্দ্রানী পরগনার অন্তর্গত সিঙ্গি গ্রামে, কায়স্থ বংশে। তার পিতার নাম কমলাকান্ত। সপ্তদশ…

  • রামায়ণ-অনুবাদ · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    কৃত্তিবাসের আবির্ভাব কাল, টীকা

    রামায়ণের অনুবাদক কৃত্তিবাসের আবির্ভাব কাল ‘কৃত্তিবাস কীর্তিবাস কবি, এ বঙ্গের অলংকার’—কৃত্তিবাস সম্পর্কে মাইকেল মধুসূদনের এই স্তুতি যথার্থ। তিনি অনুবাদ সাহিত্যের আদি কবি। কৃত্তিবাসের আত্মপরিচয় থেকে তাঁর পিতা, মাতা, ভ্রাতা, ভগ্নী প্রভৃতির পরিচয় জানা যায়। কৃত্তিবাসী রামায়ণে তার জন্ম পরিচয় কবির পূর্বপুরুষের বাস ছিল পূর্ববঙ্গ, কিন্তু সে দেশে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে তিনি পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গাতীরের নদীয়া জেলায়…

  • আধুনিক-যুগ · কথাসাহিত্য · সাহিত্য টীকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    কপালকুণ্ডলা 1866 খ্রি.

    কপালকুণ্ডলা 1866 খ্রি. – বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কপালকুণ্ডলা উপন্যাসের সাধারণ পরিচিতি দেওয়া হলো। কপালকুণ্ডলা 1866 খ্রি. রচয়িতা : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।  প্রকৃতি : রোমান্সধর্মী ঐতিহাসিক উপন্যাস।  বিষয়বস্তু : প্রকৃতি-দুহিতা ‘বনোন্মওা’ এক নারী বাস্তব সমাজ জীবনে প্রবেশ করে বাস্তবের সংঘাতে কিভাবে আবার প্রকৃতির কোলে ফিরে যায় – ইতিহাস ও রোমান্সের মিশ্রণে সেই কাহিনী আলোচ্য উপন্যাস এর বিষয়বস্তু।  নামকরণ…

  • আধুনিক-যুগ · পত্র-পত্রিকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    সোমপ্রকাশ পত্রিকা 1858

    সোমপ্রকাশ পত্রিকা ১৮৫৮       সোমপ্রকাশ আবির্ভাব :  ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই নভেম্বর এই পত্রিকা সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসাবে প্রথম আত্মপ্রকাশ করে।   পরিচিতি :  দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের সম্পাদনায় সোমপ্রকাশ পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয়। তারপর মোহনলাল বিদ্যাবাগীশের হাতে সম্পাদনার ভার দেন এবং শেষের দিকে তাঁর পুত্র উপেন্দ্রকুমার “নবপর্যায় সোমপ্রকাশ” সম্পাদনা করতেন। মাঝে কাবুলে ব্রিটিশ নীতির বিরুদ্ধাচরণ করার…

  • সাহিত্য-টীকা-আধুনিক · কাব্য কবিতা

    অগ্নিবীণা ১৯২২ খ্রি.

    অগ্নিবীণা (১৯২২ খ্রি.) কবি = কাজী নজরুল ইসলাম। প্রকৃতি = কাব্যগ্রন্থ। মূল বিষয় = বিংশ শতকের প্রথম দুই দশকে ভারতবর্ষে নতুন জীবন, নতুন সম্ভাবনার অভিব্যক্তি ও দেশাত্মবোধ এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলিতে প্রকাশিত। বৈশিষ্ট্য ও বিশেষ কথা = ‘অগ্নিবীণা’ নজরুলের প্রথম ও প্রধান কাব্যগ্রন্থ। = নজরুলের বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা এই কাব্যের অন্তর্গত। = গ্রন্থটিতে মোট বারটি (১২টি)…