চৈতন্য-চরিত-সাহিত্য মধ্যযুগ সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

ভক্তিরত্নাকর, নরহরি চক্রবর্তী

ভক্তিরত্নাকর | নরহরি চক্রবর্তী

 

দুই নামে একই ব্যক্তি

বৈষ্ণবধর্মের সমাজ ও সংস্কৃতির ঐতিহাসিক উপাদান গ্রন্থরূপে ভক্তিবাকর এক স্মরণীয় রচনা। পঞ্চাদশ তরঙ্গে বিভক্ত এই গ্রন্থের বিষয় ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ পর্যন্ত দু’শ বছরের বৈষ্ণব সমাজ ও সম্প্রদায়ের বিবরণদান। তার মধ্যে আবার পঞ্চম তরঙ্গে আছে মার্গ সঙ্গীতের বিশেষ উপস্থাপনা। গ্রন্থকার নরহরি চক্রবর্তী ও ঘনশ্যাম দাস নামে একই ব্যক্তি। কবির নিজস্ব জবানীতেই ধরা পড়ে সংশয়ের সুর,

না জানি কি হেতু হৈল মোর দুই নাম।

নরহরি দাস আর ঘনশ্যাম।

এই ‘ঘনশ্যাম’ বৈষ্ণব পদকার হিসাবেই পরিচিত (যদিও গোবিন্দদাস কবিরাজের পৌত্র পদকার ঘনশ্যাম দাসও ছিলেন)। গ্রন্থটি অষ্টাদশ শতকের প্রথমভাগে, ১৬৯৪-এর পরে রচিত হয়।

আরো পড়ুন--  শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য পৌরাণিক প্রভাব

 

গ্রন্থের বিষয়

‘ভক্তিরত্নাকর’ গ্রন্থে তিন ‘প্রভু’, ছয় ‘গোস্বামী’ এবং শ্রীনিবাস-নরোত্তম-শ্যামানন্দ-বীরচন্দ্র প্রমুখ পরবর্তী বৈষ্ণব আচার্যদের প্রসঙ্গ যেমন বর্তমান, তেমনি বৃন্দাবনের গোস্বামীদের রচিত গ্রন্থের বিবরণ, গৌড়ে প্রেরিত গ্রন্থ-সংবাদ, রাজা হাম্বীরের গ্রন্থ লুঠ, শ্রীনিবাসের উদ্ধার, রাজার সপরিবারে দীক্ষাগ্রহণ, আচার্যের দ্বিতীয় বিবাহ ও প্রতিক্রিয়া, খেতুরী মহোৎসব প্রভৃতি বিভিন্ন ঘটনার পরিচয় পাওয়া যায়। বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় লেখা গ্রন্থ থেকে প্রচুর উদ্ধৃতি, ‘সঙ্গীতপারিজাত’, “সঙ্গীতসার’, ‘সঙ্গীতদামোদর’ প্রভৃতি নানা গ্রন্থ অবলম্বনে গানের স্বর, তাল, গ্রাম, মূৰ্চ্ছনা, রাগরাগিণী, বাদ্যযন্ত্র, নৃত্য, অঙ্গাভিনয় ইত্যাদি প্রসঙ্গের অনুপুঙ্খ আলোচনা এই গ্রন্থের মধ্যে সন্নিবিষ্ট হয়েছে; যেমন এখানে আছে সালগ বা ছায়ালগ রাগে অন্ত্যানুপ্রাস বর্ণনা,

শুদ্ধ সালগের প্রায় ক্ষুদ্রগীত হয়।

অন্ত্যানুপ্রাস প্রশস্ত শাস্ত্ৰেতে কহয়॥

 

আরো পড়ুন--  চর্যাপদের রচনাকাল

গুরুত্ব

গ্রন্থটি বৈষ্ণব সমাজ-ধর্ম-শাস্ত্রের প্রায় বৃহৎ কোষগ্রন্থ বলা যায়। ‘ভক্তিরত্নাকরে’ তথ্য-উৎস সবই যে প্রামাণিক একথা বলা যায় না। বলা যায় না, গ্রন্থকার কতখানি ভক্তিভাবুক আর কতটা যুক্তিজাগর মনোভঙ্গির দ্বারা পরিচালিত হয়েছেন। প্রায় চৈতন্যচরিতামৃতে’র আদর্শে এই বিশাল গ্রন্থের পরিকল্পনা। কিন্তু কৃষ্ণদাস কবিরাজের রচনার মতো গোছানো নয়। ঘটনা, চরিত্র ও তত্ত্বকথা সব মিলেমিশে একাকার। প্রসঙ্গের দীর্ঘায়ত বিন্যাসে পর্যায়ক্রম সর্বত্র রক্ষিত হয়নি। ভাষাও অনেকক্ষেত্রে নীরস এবং কাব্যিক আবেদন জাগরণে অক্ষম।

আরো পড়ুন--  সুভাষিত রত্নকোষ বা কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়

 

কবি-পরিচিতি

বৈষ্ণব স্বভাবজাত বিনয়ে গ্রন্থকার নিজের সম্পর্কে আশ্চর্যভাবে মিতবাক্। তাঁর পিতা জগন্নাথ ছিলেন বৃন্দাবন নিবাসী বিখ্যাত বৈষ্ণব বিশ্বনাথ চক্রবর্তী শিষ্য। কবির বাসস্থান ছিল গঙ্গার পূর্ববর্তী সৈয়দাবাদের নিকটে। অল্পবয়সেই নরহরি গৃহ ছেড়ে বৃন্দাবন যান। এই গ্রন্থে নরহরির স্বরচিত এবং অপরের বহু পদ উদ্ধৃত আছে।

Similar Posts

  • আধুনিক-যুগ · পত্র-পত্রিকা · সাহিত্য টীকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    সমাচার দর্পণ 1818

    সমাচার দর্পণ 1818 [১৮১৮] সমাচার দর্পণ 1818 এর প্রকাশকাল বা আবির্ভাব ১৮১৮ সালের ২৩শে মে। ‘সমাচার দর্পণ’ প্রকাশ ও বিবর্তনের একটা দীর্ঘ ইতিহাস আছে। ১৭৯৯ সালের মে মাসে লর্ড ওয়েলেসলি সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ আইন প্রকাশ করেন। ১৯ বছর পর ১৮১৮ সালে লর্ড হেস্টিংস এই আইনটি তুলে দেন। এই সময়ই ‘সমাচার দর্পণ’ প্রকাশিত হয়। সমাচার দর্পণ 1818…

  • চণ্ডীদাস

    পদাবলির কবি চণ্ডীদাস, 15শ শতকের কবি

    পদাবলির কবি চণ্ডীদাস, 15শ শতকের কবি ভূমিকা চৈতন্য-পূর্ব যুগে বিদ্যাপতির সমসাময়িক একজন শ্রেষ্ঠ রাধাকৃষ্ণ পদাবলী রচয়িতা কবি চণ্ডীদাস। বাংলা ভাষায় তিনি প্রথম পদাবলী রচনা করেন। তাই তাঁকে সাধারণভাবে পদকর্তা চণ্ডীদাস বলা হয়। কিন্তু চণ্ডীদাসকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে জটিল সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। চণ্ডীদাস নামধারী অন্তত চারজন কবি ছিলেন বলে পণ্ডিতরা নানা তথ্য বা উপাদানকে কেন্দ্র করে…

  • সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    আর্যাতর্জা কী

    আর্যাতর্জা   ঢাক ঢোল সহযোগে ছড়া জাতীয় কোনো রচনাকে একটানা সুরে গাওয়ার রীতিকে “আর্যাতর্জা’ বলা হয়েছে। ড. সুকুমার সেন বলেছেন:  অষ্টাদশ শতকের পূর্ব হইতেই ছড়া কাটিয়া ঢোল কাঁসর সঙ্গতে গান করার পদ্ধতি ধর্মঠাকুর ও শিবের গাজনে প্রচলিত ছিল। এইরূপ ছড়াকে বলিত আর্যা অথবা তর্জা অথবা আর্যাতর্জা। ‘আর্জা’ শব্দটি সংস্কৃত ছড়া জাতীয় পদ অর্থে ব্যবহৃত হত…

  • আধুনিক-যুগ · কথাসাহিত্য · সাহিত্য টীকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    কমলাকান্তের দপ্তর 1875

    কমলাকান্তের দপ্তর 1875 : বঙ্কিমচন্দ্রের কমলাকান্তের দপ্তুর রচনা সম্পর্কে টীকা। কমলাকান্তের দপ্তর 1875 লেখক : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। প্রকৃতি : মননশীল প্রবন্ধ । ‘কমলাকান্তের দপ্তর ’ একটি বিশিষ্ট মননশীল প্রবন্ধ।  বক্তব্য : কমলাকান্ত চক্রবর্তী নামে এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ প্রসন্ন গোয়ালিনীর দধি -দুগ্ধে প্রতিপালিত হয়ে নাসিরামবাবু প্রদত্ত আফিং বটিকা সেবন করে এবং যএতএ ঘুরে বেড়িয়ে জীবনের যে অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি…

  • অন্নদামঙ্গল · মঙ্গলকাব্য · মধ্যযুগ

    ভারতচন্দ্রের রচনাবলী

    ভারতচন্দ্রের রচনাবলী   বাংলা সাহিত্যে ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর অতিপরিচিত কবি, অন্নদামঙ্গল কাব্যের একক রচয়িতা। তাঁর যেসব ভণিতা আমরা পাই তা হল—‘কবি রায়গুণাকর’, ‘দ্বিজ ভারত’, ‘ভারত ব্রাহ্মণ’ ইত্যাদি। তাঁর নামে প্রচলিত রচনাবলীর পরিচয় উল্লিখিত হল। সত্যপীরের কথা   কবির প্রথম রচনা দুটি হল সত্যপীরের পাঁচালি। একটি ত্রিপদী ছন্দে রচিত [এটির রচনাকাল জানা যায় না], অন্যটি চৌপদী ছন্দে…

  • বিদ্যাপতি

    বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাপতি সমস্যা, Discuss with best unique 3 points

    বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাপতি সমস্যা ভূমিকা বাংলা সাহিত্যের বিদ্যাপতি সমস্যা কিছুটা জটিল আকার ধারণ করেছে। বিদ্যাপতির প্রতিভা লোকমহিমায় মণ্ডিত হয়েছিল। ফলে অনেক বৈষ্ণব কবি তাঁর ভণিতায় নিজেদের পর চালিয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে পালাগানের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির জন্য কীর্তনীয়াদের দ্বারা অন্য কবির পদে বিদ্যাপতির নাম ঢুকিয়ে দেওয়া অসম্ভব কিছু নয়। বিদ্যাপতি মৈথিলী ভাষায় রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলী রচনা করেন। সমগ্র…