মঙ্গলকাব্য সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

বারমাস্যা বা বারমাসী

বারমাস্যা বা বারমাসী

 

‘বারমাস্যা’ বা ‘বারমাসী’ কথাটির অর্থ বারো মাস, অর্থাৎ একটা গোটা বৎসরের বিবরণ। প্রাচীন সাহিত্য বা মধ্যযুগের বাংলা কাব্যে লৌকিক কাহিনী বর্ণনায় নায়ক-নায়িকার বারো মাসের সুখ-দুঃখের বিবরণ আছে। মঙ্গলকাব্যে এটি এক বিশেষ লক্ষণ বা রীতি হয়ে উঠেছে।

‘বারমাসী’ কবিতাগুলির বৈশিষ্ট্য হল :

(১) বারো মাস এবং ছয় ঋতুর আবর্তনের মধ্য দিয়ে মানবচিত্তের যে রূপান্তর হয়, সমাজজীবনের যে বিবর্তন ঘটে তার পরিচয় এই জাতীয় কবিতার মধ্যে প্রকাশ পায়।

আরো পড়ুন--  তুর্কি আক্রমণ, বাংলা সাহিত্যে তার প্রভাব

(২) এর মাধ্যমে ভারতীয় কবিমানসের বৈশিষ্ট্য জাতির লোকজীবনের স্বরূপ, লোকসাহিত্যের প্রতিফলন এবং ধর্মসংস্কৃতির ও সমাজবোধের উল্লেখযোগ্য বিশিষ্টতা লক্ষিত হয়।

(৩) বারমাস্যা বর্ণনায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের চিত্র, নারীচরিত্রের মনস্তত্ত্ব, ভাষা ও সাহিত্যচর্চার উৎকর্ষের দিকগুলি ফুটে ওঠে।

(৪) ‘বারমাসী’ শব্দটি অনেক সময় ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করা হয়। এর ফলে ছয় মাস, আট মাস বা দশ মাসের সুখদুঃখ বর্ণনাকেও ‘বারামাসী’ বলা হয়ে থাকে।

(৫) বিষয়গত দিক থেকে নারীর দাম্পত্যজীবনের দুঃখ বর্ণনাই বারমাস্যার প্রধান উপজীব্য। তবে সুখের চিত্র, বিরহিনী প্রেমিকার বিলাপ ও বারমাস্যার বিষয় হয়ে থাকে। বারমাসী কবিতাগুলি প্রধানত নারী জীবনাশ্রিত। সেই তুলনায় পুরুষের বারমাসী বিষয়ক কবিতার সংখ্যা খুবই কম।

আরো পড়ুন--  কড়চা কী সাহিত্যে কড়চা

প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যে ভারতবর্ষের প্রায় সব আঞ্চলিক ভাষাতেই বারমাসী কবিতা আছে। বাংলা মঙ্গলকাব্যগুলিতে বেহুলা, লহনা, খুল্লনা, সুশীলা, ফুল্লরা প্রভৃতি নায়িকার বারমাস্যার কাহিনী আছে। দৌলত কাজীর কাব্যে সতী ময়নার বারমাস্যার চিত্র আছে। অনুবাদ সাহিত্যেও সীতা, দ্রৌপদীর বারমাস্যার বর্ণনা দেখা যায়। এর প্রভাবে বৈষ্ণব সাহিত্যে রাধা, বিষ্ণুপ্রিয়া এমনকি, গৌরাঙ্গের বারমাসী বর্ণনাও ‘গৌরাঙ্গবাদে’র কবিরা বর্ণনা করেছেন। ময়মনসিংহ গীতিকার নায়িকা মহুয়া, মলুয়া, কমলা, লীলা প্রভৃতির বারমাসী উল্লেখযোগ্য। সুতরাং বলা চলে মধ্য যুগের বাংলা সাহিত্যে ‘বারমাসী’ বা বারমাস্যা একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হয়ে দেখা দিয়েছিল।

Similar Posts

  • সাহিত্য-টীকা-আধুনিক · কাব্য কবিতা

    অশ্রুকণা ১৮৮৭ খ্রি

    অশ্রুকণা (১৮৮৭ খ্রিঃ) কবি = গিরীন্দ্রমোহিনী দাসী। প্রকৃতি = কাব্যগ্রন্থ (শোককাব্য)। মূল বিষয় = স্বামী ও পুত্র-কন্যাদের নিয়ে পারিবারিক জীবন এবং সেই মধুর জীবনের চিত্রই আলোচা কাব্যের বিষয়। বিশেষ দিক = ‘অশ্রুকণা’ কাব্যে রয়েছে নিঃসঙ্গতা অনুভব। = আলোচ্য কাব্যের অন্তর্গত কবিতাগুলি নির্বাচন করেন অক্ষয় কুমার বড়াল। = কাব্য-সুষমাবর্জিত কবিতাগুলি আধুনিক পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে। =…

  • পত্র-পত্রিকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    কল্লোল পত্রিকা 1923

    কল্লোল পত্রিকা ১৯২৩ 1923 শুরুর কথা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের পর্যালোচনা করতে গেলে দেখা যায় যে, এক একটি সাময়িক পত্র-পত্রিকা চিন্তা সৃষ্টি ও ভাবনার ক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে সাহিত্যের ক্রমবিকাশে যথেষ্ট অনুপ্রেরণা দান করেছে। রবীন্দ্রোত্তর আধুনিক যুগ নামে একটি যুগ সাহিত্যের ইতিহাসে সুচিহ্নিত হয়ে আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী কালে বাঙালির চিন্তামনন ও সৃষ্টিরাজ্যে একটা আমূল পরিবর্তন…

  • আধুনিক-যুগ · পত্র-পত্রিকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    সবুজ পত্র 1914

    সবুজ পত্র ১৯১৪   আবির্ভাব ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপে ভ্রমণ শেষে রবীন্দ্রনাথের আশাবাদী-কল্যাণবাদী মন যুদ্ধের মধ্যেই প্রত্যাশা করেছিলেন শুভ প্রভাতের সম্ভাবনা। যুদ্ধ তাঁর কাছে জড়তা ও অশুভ অন্ধকার থেকে মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছিল। রবীন্দ্রনাথ ইউরোপ-আমেরিকা ভ্রমণপর্বে ‘গীতাগুলি’র (১৯১০ খ্রিঃ) বাণী ও ভারতীয় অধ্যাত্মবাদের বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। তাই রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘সাধনা’ প্রকাশের মতোই প্রমথ…

  • চর্যাপদ · প্রাচীনযুগ · সাহিত্য-টীকা-প্রাচীন

    চর্যাপদ-এর টীকাকার মুনিদত্ত [টীকা]

    চর্যাপদ-এর টীকাকার মুনিদত্ত ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে নেপালে প্রাপ্ত চর্যাগীতিসহ মোট চারখানি পুথি “হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা” নামে প্রকাশ করেন। চর্যাগীতিকারের সঙ্গে তার সংস্কৃত টীকাও ছিল। কিন্তু পুথিটির কয়েকটি পৃষ্ঠা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় টীকাকারের নাম পাওয়া যায়নি। পরে ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচী ঐ একই সংকলনের তিব্বতী…

  • সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ · রামায়ণ-অনুবাদ

    অদ্ভুত রামায়ণ

    অদ্ভুত রামায়ণ কবি = অদ্ভুত আচার্য। প্রকৃতি = অনুবাদ জাতীয়। বিশেষ কথা = রামায়ণের সাতকাণ্ডের ভাবানুবাদ করেছিলেন কবি। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে রজনীকান্ত চক্রবর্তীর সম্পাদনায় রংপুর সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত হয়। বৈশিষ্ট্য ++ তাঁর কাব্য কৃত্তিবাসের কাব্য অপেক্ষা বৃহদায়তন। ++ পয়ার, ত্রিপদী ছন্দ ও আধুনিক শব্দের প্রচুর প্রয়োগে কাব্যটি উল্লেখযোগ্য। যেমন, রামের বনগমনে কৌশল্যার বিলাপ “আমাকে ছাড়িয়া…

  • আধুনিক-যুগ · পত্র-পত্রিকা · সাহিত্য টীকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    সমাচার দর্পণ 1818

    সমাচার দর্পণ 1818 [১৮১৮] সমাচার দর্পণ 1818 এর প্রকাশকাল বা আবির্ভাব ১৮১৮ সালের ২৩শে মে। ‘সমাচার দর্পণ’ প্রকাশ ও বিবর্তনের একটা দীর্ঘ ইতিহাস আছে। ১৭৯৯ সালের মে মাসে লর্ড ওয়েলেসলি সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ আইন প্রকাশ করেন। ১৯ বছর পর ১৮১৮ সালে লর্ড হেস্টিংস এই আইনটি তুলে দেন। এই সময়ই ‘সমাচার দর্পণ’ প্রকাশিত হয়। সমাচার দর্পণ 1818…