সাহিত্য-টীকা-প্রাচীন সূচনা

সদুক্তিকর্ণামৃত – শ্রীধর দাস

সদুক্তিকর্ণামৃত

 
 

বাংলাদেশে সংকলিত একটি জনপ্রিয় চয়নিকা হল ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’। এই চয়নিকার সংকলক হলেন রাজা লক্ষ্মণসেনের ‘প্রেমৈক পাত্র সখা’ বটুদাসের সুযোগ্য পুত্র ‘মহামাণ্ডলিক’ শ্রীধর দাস। এই চয়নিকাতে দ্বাদশ-ত্রয়োদশ  শতকের বাঙালি জীবন ও সমকালীন সমাজের যে প্রতিফলন প্রতিফলিত হয়েছে, সেদিক থেকে উক্ত গ্রন্থের গুরুত্ব যথেষ্ট। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য এই চয়নিকার প্রভাব অপরিসীম।

১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’ সংকলিত হয়। এতে মোট পাঁচটি প্রবাহ এবং এক একটি প্রবাহে কয়েকটি বীচি এবং প্রত্যেক বীচি-তে পাঁচটি করে কবিতা সংগৃহীত হয়েছে। কবিতার সংখ্যা ২৩৭০টি এবং মোট কবির সংখ্যা ৪৮৫ জন। এতে অজ্ঞাত পরিচয় ৮০ জন কবি (সম্ভবত বাঙালি) ছাড়া কালিদাস, ভাস, ভামহ, ভর্তৃহরি, উমাপতিধর, জয়দেব প্রভৃতি বাঙালি কবিদের শ্লোক স্থান পেয়েছে।

আরো পড়ুন--  কল্লোল পত্রিকা 1923

‘সদুক্তিকর্ণামৃত’ মতো সংকলন গ্রন্থের গুরুত্ব যথেষ্ট। যেমন,

(এক) চয়নিকার সংগৃহীত শ্লোকাবলী থেকে বাংলার চিরকালীন রূপ, বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি, আচার-ব্যবহার, ধর্ম-দর্শন এবং বাংলার বৈষ্ণব ও শাক্ত সাহিত্যের স্বরূপ সম্পর্কে বহু তথ্য সংগ্রহ করা যায়।

(দুই) মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে এই সংকলন গ্রন্থের প্রত্যক্ষ প্রভাব না পড়লেও পরোক্ষভাবে বৈষ্ণব পদাবলীতে এবং মঙ্গলকাব্যে দৈনন্দিন জীবনবিষয়ক কবিতাগুলোর প্রতিফলন পড়েছে।

আরো পড়ুন--  প্রকীর্ণ শ্লোক ও সংকলন গ্রন্থ

(তিন) বাংলা সাহিত্য সৃষ্টির পূর্বে বাঙালি যে বিভিন্ন শ্লোক রচনার মধ্য দিয়ে তার লিরিকধর্মী মনের পরিচয় প্রকাশ করছিল, তার প্রমাণ মেলে এই সংকলন গ্রন্থে।

(চার) গ্রন্থটি বাঙালি কবিদের রচিত এবং বাঙালির দ্বারা সংকলিত পদসংকলন গ্রন্থ।

(পাঁচ) ক্ষিতিমোহন সেন এই গ্রন্থসম্পর্কে বলেছেন, ‘নানা কবির রচনা হইতে মাধুকরী বৃত্তিতে সংগ্রহ করিবার কাজটা হয়তো বাংলাদেশে আরম্ভ হইয়াছিল’।

আরো পড়ুন--  অগ্নিবীণা ১৯২২ খ্রি.

‘সদুক্তিকর্ণামৃত’র নমুনা :

চলৎকাষ্ঠং গলৎকুড্যমুত্তানতৃণসঞ্চয়ম্‌।

গণ্ডু পদার্থি মুণ্ডুকাকীর্ণং জীর্ণং গৃহং মম।।

অর্থাৎ, এখানে কুটিরে ঘেরা বাংলার গ্রামের চিরদারিদ্র্যের ছবি। বর্ষায় কাঠের খুঁটি প্রায় ভেঙে পড়ে, মাটির দেওয়াল ধ্বসে যায়, জীর্ণ গৃহ মুণ্ডুকাকীর্ণ হয়ে পড়ে।

 
 
 
 

Similar Posts

  • আধুনিক-যুগ · পত্র-পত্রিকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    সম্বাদ প্রভাকর 1831

    সম্বাদ প্রভাকর ১৮৩১             সম্পাদক, প্রকাশকাল/আবির্ভাব :  সাপ্তাহিক ‘সম্বাদ প্রভাকর’ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সম্পাদনায় ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দের ২৮শে জানুয়ারি প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে ‘সম্বাদ প্রভাকরে’র মাসিক সংস্করণ প্রকাশিত হয়। শেষ পর্যন্ত ‘সম্বাদ প্রভাকর’ সাপ্তাহিক, মাসিক এবং দৈনিক প্রকাশিত হতে থাকে।   পরিচিতি:  ‘সম্বাদ প্রভাকর’ সপ্তাহে তিনবার প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকা প্রথম…

  • আধুনিক-যুগ · পত্র-পত্রিকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    দিগদর্শন পত্রিকা 1818

    দিগ্‌দর্শন পত্রিকা ১৮১৮         আবির্ভাব/প্রকাশকালঃ এপ্রিল, ১৮১৮। সম্পাদক।   পরিচিতি : বাংলা ভাষায় প্রথম প্রকাশিত পত্রিকা দিগদর্শন। এটি একটি মাসিক পত্রিকা। শ্রীরামপুর মিশন থেকে প্রকাশিত হত পত্রিকাটি। সম্পাদক ছিলেন জন ক্লার্ক মার্শম্যান।   সমাজ ও সংস্কৃতিতে গুরুত্ব/অবদান :  পত্রিকাটির বিশেষ গুরুত্ব এই যে, এটি ‘যুবালোকের কারণ সংগৃহীত নানা উপদেশ ও তথ্যে সমৃদ্ধ’…

  • সূচনা

    প্রাকৃত ও অপভ্রংশ ভাষায় রচিত সাহিত্য

    প্রাকৃত ও অপভ্রংশ ভাষায় রচিত সাহিত্য   প্রাকৃত ও অপভ্রংশ ভাষার সঙ্গে প্রাচীন বাঙালি ও বাংলা সাহিত্যের সম্পর্ক আদৌ দুরত্বের নয়। ভাষাগত দৃষ্টিকোণে ‘প্রাকৃত’ বা ‘অপভ্রংশ’ নামকরণের কারণ, সংস্কৃত বাগভঙ্গী থেকে তার বিচ্যাুতি : ‘Speech fallen off (from the norm) vulgar speech” (Growth of Gujarati Language, M. R. Majumder, Journal of the University of Bombay,…

  • সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    আর্যাতর্জা কী

    আর্যাতর্জা   ঢাক ঢোল সহযোগে ছড়া জাতীয় কোনো রচনাকে একটানা সুরে গাওয়ার রীতিকে “আর্যাতর্জা’ বলা হয়েছে। ড. সুকুমার সেন বলেছেন:  অষ্টাদশ শতকের পূর্ব হইতেই ছড়া কাটিয়া ঢোল কাঁসর সঙ্গতে গান করার পদ্ধতি ধর্মঠাকুর ও শিবের গাজনে প্রচলিত ছিল। এইরূপ ছড়াকে বলিত আর্যা অথবা তর্জা অথবা আর্যাতর্জা। ‘আর্জা’ শব্দটি সংস্কৃত ছড়া জাতীয় পদ অর্থে ব্যবহৃত হত…

  • আধুনিক-যুগ · পত্র-পত্রিকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    সম্বাদ কৌমুদী 1821

    সম্বাদ কৌমুদী ১৮২১         প্রকাশকাল/আবির্ভাব :  সমাচার দর্পণে প্রায়ই হিন্দুধর্ম ও সমাজকে অকারণে গালিগালাজ করা হত। এর প্রতিবিধান করবার জন্য ১৮২১ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর রাজা রামমোহন রায় ও ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘সম্বাদ কৌমুদী’ পত্রিকাটি প্রকাশ করে ‘সমাচার দর্পণে’ প্রকাশিত মিশনারীদের হিন্দুধর্মের প্রতি আক্রমণের যথোপযুক্ত জবাব দেন।   সম্পাদক/পরিচিতি :  সম্বাদ কৌমুদীর প্রথম সম্পাদক…

  • মঙ্গলকাব্য · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    বারমাস্যা বা বারমাসী

    বারমাস্যা বা বারমাসী   ‘বারমাস্যা’ বা ‘বারমাসী’ কথাটির অর্থ বারো মাস, অর্থাৎ একটা গোটা বৎসরের বিবরণ। প্রাচীন সাহিত্য বা মধ্যযুগের বাংলা কাব্যে লৌকিক কাহিনী বর্ণনায় নায়ক-নায়িকার বারো মাসের সুখ-দুঃখের বিবরণ আছে। মঙ্গলকাব্যে এটি এক বিশেষ লক্ষণ বা রীতি হয়ে উঠেছে। ‘বারমাসী’ কবিতাগুলির বৈশিষ্ট্য হল : (১) বারো মাস এবং ছয় ঋতুর আবর্তনের মধ্য দিয়ে মানবচিত্তের…