চর্যাপদ প্রাচীনযুগ সাহিত্য-টীকা-প্রাচীন

চর্যাপদ-এর টীকাকার মুনিদত্ত [টীকা]

চর্যাপদ-এর টীকাকার মুনিদত্ত

১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে নেপালে প্রাপ্ত চর্যাগীতিসহ মোট চারখানি পুথি “হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা” নামে প্রকাশ করেন। চর্যাগীতিকারের সঙ্গে তার সংস্কৃত টীকাও ছিল। কিন্তু পুথিটির কয়েকটি পৃষ্ঠা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় টীকাকারের নাম পাওয়া যায়নি। পরে ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচী ঐ একই সংকলনের তিব্বতী অনুবাদ আবিষ্কার করেছিলেন। তাতেই টীকাকার হিসেবে মুনিদত্তের নাম পাওয়া যায়। অনুমান করা যায় যে, চর্যাগীতির দুর্বোধ্যতা নিরাকরণের জন্যই মুনিদত্ত এই পদগুলিকে একত্র করেছিলেন এবং বিশেষভাবে অধিকারী জনের জন্যই সংস্কৃত ভাষায় পদগুলির সহজবোধ্য টীকা রচনা করেছিলেন।

মুনিদত্ত সম্ভবত ১৪শ শতাব্দীতে বর্তমান ছিলেন। বজ্রযান ও সহজযানে তাঁর যে বিশেষ অধিকার ছিল, তা এই সংস্কৃত টীকা থেকেই বোঝা যায়। তিনি চর্যার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বৌদ্ধতান্ত্রিক পারিভাষিক শব্দগুলির যথাসম্ভব সরলার্থ করেছেন এবং বজ্রযান ও সহজযানের অন্যান্য প্রামাণিক গ্রন্থ থেকেও অনেক উদ্ধৃতির উল্লেখ করেছেন। এমনকি ‘পরদর্শন’ অর্থাৎ সহজিয়া মত ভিন্ন অন্যান্য ধর্ম সম্প্রদায়ের দার্শনিক মত প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত করেছেন। আমরা যদি মুনিদত্তের টীকা না পেয়ে শুধু ‘চর্যাচয়’ এবং তিব্বতী অনুবাদ পেতাম, তাহলে চর্যাগীতির দার্শনিক বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করা কঠিন হত। কারণ তিব্বতী অনুবাদ প্রধানত আক্ষরিক, তা দিয়ে বজ্রযান ও সহজযানের সূক্ষ্ম তত্ত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত করা দুরূহ হত। মুনিদত্তের কতটুকু ‘সহজধর্মে’ অধিকার ছিল, সে বিষয়েও কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এবং সংস্কৃত টীকাটির যাথার্থ্য সম্বন্ধেও প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু মুনিদত্তের টীকায় উদ্ঘাটিত তত্ত্ব সংস্কৃত ও অপভ্রংশে রচিত মন্ত্রযান বিষয়ক নানা গ্রন্থে বর্ণিত দার্শনিক তত্ত্বের বিরোধী নয়, এবং মুনিদত্ত স্বমত প্রমাণ করতে গিয়ে বহু সংস্কৃত, অপভ্রংশ ও দেশীয় ভাষায় রচিত গ্রন্থাদি থেকে উল্লেখ করেছেন। অতএব তাঁর টীকাকে অযথার্থ বলে ত্যাগ করা উচিত হবে না।

আরো পড়ুন--  সুভাষিত রত্নকোষ বা কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়

একটু অন্য লেখা – চর্যাপদের কবি ২৪ নাকি ২৩?


আধুনিক পণ্ডিতদের অনুমান, মূল পুথির নাম ‘চর্যাগীতিকোষ’ এবং মুনিদত্তকৃত সংস্কৃত টীকার নাম ‘নির্মলগিরা টীকা’। মুনিদত্তকৃত সূচনা-শ্লোকের “নির্মলগিরাং টীকাং বিধান্যো স্ফুটম্” উক্তির দ্বারা একথা প্রমাণিত হয়।

মুনিদত্ত সংকলিত ও টীকাকৃত মূল পুথিতে পঞ্চাশটি (মতান্তরে একান্নটি) চর্যা ছিল। তার মধ্যে ১১ সংখ্যক চর্যার বৃত্তি মুনিদত্ত কর্তৃক রচিত হয়নি। নেপালী লিপিকার নকলের সময় ঐ পদটির ব্যাখ্যা নেই দেখে নকল করা পুথিতেও ঐ পদটি বাদ দিয়েছিলেন। তিব্বতী অনুবাদকও ব্যাখ্যা নেই দেখে ঐ পদের তিব্বতী অনুবাদ করেন নি। এর থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় যে তিব্বতী অনুবাদক মুনিদত্তের টীকার উপর যথেষ্ট নির্ভর করেছিলেন এবং তিব্বতী অনুবাদ অপেক্ষা টীকার মূল্য অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।

আরো পড়ুন--  সদুক্তিকর্ণামৃত - শ্রীধর দাস

বস্তুত চর্যাগীতি আস্বাদনের প্রধান সহায় হল মুনিদত্তের সংস্কৃতভাষ্য ‘নির্মলগিরা টীকা’। টীকাই চর্যা-বোধিনী।

Similar Posts

  • অন্যান্য-বৈষ্ণবসাহিত্য · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    উজ্জ্বলনীলমণি, শ্রীরূপ গোস্বামী

    উজ্জ্বলনীলমণি, শ্রীরূপ গোস্বামী শ্রীরূপ গোস্বামীর লিখিত সাহিত্যের উজ্জ্বল নিদর্শন হল ‘উজ্জ্বলনীলমণি’। বৃন্দাবনের ষড়গোস্বামীদের মধ্যে জ্ঞানী ও ভক্ত রূপ গোস্বামী তাঁর এই গ্রন্থে বৈষ্ণব রসতত্ত্বের নানান দিক আলোচনা করেছেন— যা বৈষ্ণব সমাজে বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। ‘উজ্জ্বলনীলমণি’-তে পাঁচটি মুখ্যরসের প্রধানতম যে রস শৃঙ্গার, মধুর বা উজ্জ্বল রস – তাকে অধ্যাত্ম ব্যঞ্জনার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। ‘ভক্তিরসামৃতসিন্ধু’-তে বৈষ্ণব…

  • আধুনিক-যুগ · কথাসাহিত্য · সাহিত্য টীকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    কমলাকান্তের দপ্তর 1875

    কমলাকান্তের দপ্তর 1875 : বঙ্কিমচন্দ্রের কমলাকান্তের দপ্তুর রচনা সম্পর্কে টীকা। কমলাকান্তের দপ্তর 1875 লেখক : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। প্রকৃতি : মননশীল প্রবন্ধ । ‘কমলাকান্তের দপ্তর ’ একটি বিশিষ্ট মননশীল প্রবন্ধ।  বক্তব্য : কমলাকান্ত চক্রবর্তী নামে এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ প্রসন্ন গোয়ালিনীর দধি -দুগ্ধে প্রতিপালিত হয়ে নাসিরামবাবু প্রদত্ত আফিং বটিকা সেবন করে এবং যএতএ ঘুরে বেড়িয়ে জীবনের যে অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি…

  • সাহিত্য-টীকা-আধুনিক · কথাসাহিত্য

    অশনি সংকেত ১৯৫৯ খ্রি.

    অশনি সংকেত (১৯৫৯ খ্রিঃ) লেখক = বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সংরূপ = উপন্যাস। মূল বিষয় = ১৩৫০-এর মন্বন্তরে শহর থেকে দূরে গ্রামাঞ্চলের মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ, দুর্দশা ও লাঞ্ছনার বাস্তব চিত্র পরিস্ফুটিত হয়েছে। বিশেষ দিক > তেরশ পঞ্চাশের মন্বন্তরের পটভূমিকায় গ্রন্থটি রচিত হলেও লেখকের মৃত্যুর পর ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে তা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ১৩৫০ থেকে ১৩৫২ সাল পর্যন্ত ‘মাতৃভূমি’…

  • মধ্যযুগ · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    গঙ্গারামের মহারাষ্ট্র পুরাণ

    গঙ্গারামের মহারাষ্ট্র পুরাণ : প্রাগাধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক কাব্য বলতে যা বোঝায়, এই কাব্য কতকটা সেইরকম। গঙ্গারামের মহারাষ্ট্রপুরাণ  চৈতন্যচরিত সাহিত্যে তথ্যাশ্রয়ী যুগ-বীক্ষণের সূচনা হয়। কাব্যের মধ্যে সমকালীন ইতিহাসের প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল তবু তা পূর্ণরূপ নয় পদক্ষেপ, পূর্ণাঙ্গ, কাহিনীর আশ্রয়ে নয়, অনুসঙ্গী ও সহায়িকার রূপে তা স্থান পায়। সেই রূঢ় বাস্তবের তাপ ও ইতিহাসের…

  • মঙ্গলকাব্য · মধ্যযুগ · মনসামঙ্গল · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    বাইশা বা বাইশ কবির মনসামঙ্গল

    বাইশা বা বাইশ কবি বহুশ্রুতি এবং বহুকবির চিন্তাচর্চায় মনসামঙ্গল কাব্যধারা বিকশিত হয়ে ওঠে। তবে দৈনন্দিন পূজা ও পাঠে ঘটে জনপ্রিয়তা এবং কাব্যের কোজাগরী প্রতিষ্ঠা লাভ হয় পূর্ববঙ্গে। কাব্যটিকে ভালোবাসার জন্য স্বভাবতই ভালো লাগার উপযোগী বিভিন্ন কবির রচিত পংক্তিগুচ্ছকে একটি সঙ্কলনের মাধ্যমে গ্রথিত করে একটি সম্মেলক কাব্য বা সঙ্গীত সংকলনের অস্তিত্ব থাকা ছিল খুব স্বাভাবিক ঘটনা।…

  • সাহিত্য-টীকা-প্রাচীন · সূচনা

    প্রাকৃতপৈঙ্গল

    প্রাকৃতপৈঙ্গল প্রাকৃতপৈঙ্গল কী? ভাব, বিষয়বস্তু ও ভাষা-কৌশলের দিক থেকে এই গ্রন্থটি বাঙালী জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। গ্রন্থটি শৌরসেনী প্রাকৃত ও অপভ্রংশে লেখা হয়। বিভিন্ন কবি-রচিত শ্লোকের সঙ্কলন। সংকলকের নাম, পিঙ্গল। ইনি ‘পিঙ্গল ছন্দসূত্র‘ গ্রন্থাকার নন। পণ্ডিতজনের অনুমান, ১৪শ শতাব্দীতে কাশীধামে ‘প্রাকৃতপৈঙ্গল’ সঙ্কলিত হয়। এই গ্রন্থেও রাধা ও গােপালীলার উল্লেখ আছে, আছে বিভিন্ন দেবদেবীর…