সাহিত্য-টীকা-আধুনিক কথাসাহিত্য

অশনি সংকেত ১৯৫৯ খ্রি.

অশনি সংকেত (১৯৫৯ খ্রিঃ)

লেখক = বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

সংরূপ = উপন্যাস।

মূল বিষয় = ১৩৫০-এর মন্বন্তরে শহর থেকে দূরে গ্রামাঞ্চলের মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ, দুর্দশা ও লাঞ্ছনার বাস্তব চিত্র পরিস্ফুটিত হয়েছে।

বিশেষ দিক

> তেরশ পঞ্চাশের মন্বন্তরের পটভূমিকায় গ্রন্থটি রচিত হলেও লেখকের মৃত্যুর পর ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে তা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ১৩৫০ থেকে ১৩৫২ সাল পর্যন্ত ‘মাতৃভূমি’ পত্রিকায় এই উপন্যাস ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।

> মন্বন্তরের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় মানুষের কান্না ও অধঃপতন, মানবতার লাঞ্ছনা ও বেদনা লেখককে এতটাই বিচলিত করেছিল যে তিনি তাঁর পূর্বের মানসিকতা থেকে সরে এসে এ ধরনের ভিন্ন স্বাদের রচনায় ব্রতী হন।

> উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র গঙ্গাচরণের ঘরে আশ্রিত ছিল দুর্গা ভচার্য। মন্বন্তরের অনাহার ও অন্নাভাবের কারণে দুর্গা ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করতে কুণ্ঠিত হয় না। কিন্তু মন্বন্তরে যে ভিক্ষা মেলে না, তা তার বাস্তব অভিজ্ঞতায় ছিল না। উপন্যাসে দেখি, গঙ্গাচরণ ব্রাহ্মণের পরান্নজীবী মানসিকতার মূলে আঘাত করেছেন—“চায়া লাঙল ধরে চাষ করে, আমরা তার উপর বসে খাই, এ ব্যবস্থা ছিল বলেই আজ আমাদের এই দুর্দশা।”

আরো পড়ুন--  কবি চূড়ামণি দাসের কবি পরিচয়, গৌরাঙ্গবিজয় কাব্যের পরিচয়

> এই মন্বন্তর যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী ফল তাও দীনু ভট্টাচার্যের সঙ্গে গঙ্গাচরণের কথোপকথনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—“আরও নাকি চড়বে শুনছি। এখনই খেতে পাচ্চি নে—আরও বাড়লে কি কিনে খেতে পারবো। এই যুদ্ধের দরুন নাকি অমনটা হচ্চে-।”

> বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মন্বন্তরের আর এক কারণ যে মজুতদারি, চোরাচালান, কালোবাজারি বা মুনাফাখোর ব্যবসাদারদের চক্রান্ত তাও চিত্রিত হয়েছে উপন্যাসে।→ অন্নের অভাবে অখাদ্য, কুখাদ্য ভক্ষণ-এর স্বরূপ জেলের বৌ-র কচুডাঁটা তুলে নিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে চিত্রিত হয়েছে। আবার মতি মুচিনীর মৃত্যু প্রমাণ করে অনাহারে মৃত্যুর বাস্তব চিত্রকে।

আরো পড়ুন--  আলালের ঘরের দুলাল 1858, প্যারীচাঁদ মিত্র 

> উপন্যাসের নামকরণ প্রসঙ্গে গ্রন্থে বর্ণিত মতি মুচিনীর মৃত্যু—“ও যেন গ্রামের লোকের চোখ ফুটিয়ে দিয়ে গেল। একটি মূর্তিমান বিপদের সংকেত স্বরূপ ওর মৃতদেহটা পড়ে রয়েছে আমগাছটার তলায়। অনাহারে প্রথম মৃত্যুর অশনি সংকেত।”

> উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র গঙ্গাচরণ চক্রবর্তীর অভিজ্ঞতায় মন্বন্তরের আলেখ্যউপস্থাপিত হলেও উপন্যাসে কোনো সংহত কাহিনি বা আখ্যান নেই।

** অন্নাভাব, অনাহার, বিপর্যয়ের ছবি আঁকতে গিয়ে পল্লীবাংলার প্রাকৃতিক দৃশ্য লেখকের নজর এড়িয়ে যায়নি।

আরো পড়ুন--  ভক্তিরসামৃতসিন্ধু, শ্রীরূপ গোস্বামী

** উপন্যাসে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও মৃত্যুর উপর জয়ী হয়েছে অমলিন মনুষ্যত্ব ও আত্মরক্ষারস্বরূপ।

** অনঙ্গ বৌর সংগ্রাম শুধু বাঁচার নয়, বাঁচানোর। মতি চলে গেলেও যদুপাড়ার হাতছানি থেকে ফিরে এসেছে কাপালী বৌ। ক্ষুধা হেরে গেল মনুষ্যত্বের কাছে, আর এখানেই শিল্পী বিভূতিভূষণের মুন্সিয়ানা।

** সত্যজিৎ রায়ের এই উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ণ চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।

Similar Posts

  • সাহিত্য-টীকা-প্রাচীন · সূচনা

    রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজসভায় সাহিত্যচর্চা

    রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজসভায় সাহিত্যচর্চা লক্ষ্মণসেনের রাজসভায় ‘পঞ্চরত্ন’-এর সমাবেশ ঘটেছিল; এঁরা হলেন কবি জয়দেব, উমাপতি ধর, শরণ, ধোয়ী, গোবর্ধন আচার্য। জয়দেবের গীতগোবিন্দে’র প্রশস্তি-শ্লোক, সুভাষিতাবলীর (১৫শ শতাব্দী) শ্লোক এবং ‘বৈষণবতাষণী’ টীকা-গ্রন্থের সাক্ষ্যে মনে হয়, এঁরা ছিলেন সমসাময়িক। জয়দেবের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন স্বরাজ্যে সম্রাট। উমাপতি ধর উমাপতি ধরের কাব্যকলার পরিচয় বহন করছে দেওপাড়া এবং মাধাই…

  • কথাসাহিত্য · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কালান্তর’ 1956

    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কালান্তর’ 1956: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কালান্তর’ (১৯৫৬) উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথের ‘কালান্তর’ যেখানে ছিল প্রবন্ধ সংকলন, তারাশঙ্করের ‘কালান্তর’ সেখানে একটি আত্মজৈবনিক উপন্যাস, যা ব্যক্তি ও সমাজের পরিবর্তনের এক কালানুক্রমিক দলিল। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কালান্তর’ 1956 : অবক্ষয়িত গ্রাম ও ব্যক্তি-জীবনের সন্ধিক্ষণ ## উপন্যাসের পটভূমি ও চরিত্রায়ন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর নিজের জীবনের…

  • সাহিত্য-টীকা-প্রাচীন · সূচনা

    সদুক্তিকর্ণামৃত – শ্রীধর দাস

    সদুক্তিকর্ণামৃত     বাংলাদেশে সংকলিত একটি জনপ্রিয় চয়নিকা হল ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’। এই চয়নিকার সংকলক হলেন রাজা লক্ষ্মণসেনের ‘প্রেমৈক পাত্র সখা’ বটুদাসের সুযোগ্য পুত্র ‘মহামাণ্ডলিক’ শ্রীধর দাস। এই চয়নিকাতে দ্বাদশ-ত্রয়োদশ  শতকের বাঙালি জীবন ও সমকালীন সমাজের যে প্রতিফলন প্রতিফলিত হয়েছে, সেদিক থেকে উক্ত গ্রন্থের গুরুত্ব যথেষ্ট। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য এই চয়নিকার প্রভাব অপরিসীম। ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’ সংকলিত…

  • প্রাচীনযুগ · সাহিত্য-টীকা-প্রাচীন

    চর্যাপদের রচনাকাল

    চর্যাপদ বা চর্যাগান কিংবা চর্যাগীতি হলো বাংলা ভাষার আদিতম নিদর্শন। এখন এই পদ বা গানগুলির রচনাকাল নিয়ে নানা ধোঁয়াশা থাকবে তা স্বাভাবিক। এই লেখায় চর্যাপদের রচনাকাল সম্বন্ধে সাধারণ কিছু কথা তুলে ধরা হয়েছে। চর্যাপদের রচনাকাল বা চর্যাগীতির রচনাকাল প্রাচীন বাংলাভাষার অদ্বিতীয় নিদর্শন চর্যাপদ শুধু  ভাষা এবং ধর্মের রহস্যইসূচীভেদ্য নয়, তার রচনাকালও সংশয়ান্বিত। ভাষাতত্ত্বের দুই প্রতিনিধিস্থানীয়…

  • আধুনিক-যুগ · পত্র-পত্রিকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    মাসিক পত্রিকা 1854

    মাসিক পত্রিকা ১৮৫৪   প্রকাশকাল/আবির্ভাব ১৮৫৪ সালের ১৬ই আগস্ট ‘মাসিক পত্রিকা’র আত্মপ্রকাশ।  সম্পাদক/পরিচিতি রাধানাথ শিকদার ও প্যারীচাঁদ মিত্র-র উদ্যোগে কলকাতায় মাসিক পত্রিকা নামে ক্ষুদ্র পত্রিকা প্রকাশিত হয়। লক্ষ্য/উদ্দেশ্য ‘মাসিক পত্রিকার প্রধান লক্ষ্য ছিল ভাষাকে সংস্কৃত আনুগত্য থেকে মুক্ত করা, স্ত্রী সমাজ ও বালকদের বোধগম্য করে তোলা। এছাড়া রাধানাথ সহজ সরল বাংলা ভাষার পক্ষপাতী। অক্ষয়কুমারের গদ্য…

  • মধ্যযুগ · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    গঙ্গারামের মহারাষ্ট্র পুরাণ

    গঙ্গারামের মহারাষ্ট্র পুরাণ : প্রাগাধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক কাব্য বলতে যা বোঝায়, এই কাব্য কতকটা সেইরকম। গঙ্গারামের মহারাষ্ট্রপুরাণ  চৈতন্যচরিত সাহিত্যে তথ্যাশ্রয়ী যুগ-বীক্ষণের সূচনা হয়। কাব্যের মধ্যে সমকালীন ইতিহাসের প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল তবু তা পূর্ণরূপ নয় পদক্ষেপ, পূর্ণাঙ্গ, কাহিনীর আশ্রয়ে নয়, অনুসঙ্গী ও সহায়িকার রূপে তা স্থান পায়। সেই রূঢ় বাস্তবের তাপ ও ইতিহাসের…