মঙ্গলকাব্য মধ্যযুগ সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

জাগরণ পালা, সাহিত্য টীকা

জাগরণ পালা | সাহিত্য টীকা

 
 
সারারাত জেগে নৃত্যগীতের যে অনুষ্ঠান করা হত, মধ্যযুগের বঙ্গদেশে সাধারণত তাকেই ‘জাগরণ’ বা ‘জাগের গান’ বলা হতো। এই জাতীয় গানের মধ্যে উত্তরবঙ্গের ধামালী গান এবং ঝুমুর গানের নাম উল্লেখ করা যায়। এই গানগুলির যে অংশ গভীর রাতে না ঘুমিয়ে পড়ে ভোর পর্যন্ত গাওয়া হতো, তাকেই বলা হতো জাগরণ পালা। ধামালী গানের মধ্যে ‘রাধার নাক তোলা পালা’, ‘কৃষ্ণের মাছধরা পালা’ প্রভৃতিকে জাগের গান বলে উল্লেখ করা যায়। এই পালাগানগুলির বৈশিষ্ট্য হলো, লৌকিক গল্প বা কাহিনি হালকা সুরে অশ্লীল ভঙ্গিতে গভীর রাতে গাওয়া হতো।
 
মঙ্গলকাব্যের আসরেও জাগরণ পালাগানের প্রচলন ছিল। মঙ্গলকাব্যের অনেকগুলির পালা ছিল ‘অষ্টমঙ্গলা’ অর্থাৎ আট দিন ধরে গাওয়া হতো। পূর্ববঙ্গে এর নাম ছিল ‘রয়ানী’ গান। এর কোনো অংশ রাতে গাইবার জন্য নির্বাচিত হলে তাকেই ‘জাগরণ পালা’ বলা যায়। চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে শ্রীমন্ত সদাগরের ‘মশান’ কাহিনিটি জাগরণ পালা পর্যায়ের মধ্যে পড়ে। অনুরূপভাবে, মনসামঙ্গল কাব্যে ‘লখীন্দরের পুনর্জীবন লাভ’ এবং ধর্মমঙ্গল কাব্যে লাউসেনের ‘পশ্চিমে সূর্যোদয় জাগরণ’ কাহিনিও এই পালাগানের মধ্যে পড়ে। 
 
সুকুমার সেন লিখেছেন, “চণ্ডীমঙ্গল,মনসামঙ্গল ও ধর্মমঙ্গল প্রভৃতি পাঞ্চালী কাব্যের উপাখ্যানের ক্লাইম্যাক্স থাকে উপসংহারের ঠিক আগের কাহিনিতে। কাব্যের পক্ষে এটি সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা। এই অংশটি সারারাত ধরিয়া গাওয়া হইত বলিয়া এই পালার নাম জাগরণ”। তাঁর মতে  “চাটিগাঁ প্রভৃতি অঞ্চলে চণ্ডীমঙ্গলের নামান্তর ‘জাগরণ’। (বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস । প্রথমার্ধ)
  

Similar Posts

  • মহাভারত অনুবাদ · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    কবীন্দ্র পরমেশ্বর

    কবীন্দ্র পরমেশ্বর : মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কবীন্দ্র পরমেশ্বর এক অবিস্মরণীয় নাম। কবীন্দ্র পরমেশ্বর: বাংলা মহাভারতের আদি রচয়িতা ## জীবনী ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা কবীন্দ্র পরমেশ্বর ছিলেন মধ্যযুগের সেই বিরল কবিদের একজন, যাঁদের হাত ধরে হিন্দু মহাকাব্য মুসলিম রাজদরবারে সমাদৃত হয়েছিল। তিনি চট্টগ্রামের লস্কর বা শাসক পরাগ খাঁ-র সভাকবি ছিলেন। পরাগ খাঁ ছিলেন বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন…

  • আধুনিক-যুগ · পত্র-পত্রিকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    সবুজ পত্র 1914

    সবুজ পত্র ১৯১৪   আবির্ভাব ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপে ভ্রমণ শেষে রবীন্দ্রনাথের আশাবাদী-কল্যাণবাদী মন যুদ্ধের মধ্যেই প্রত্যাশা করেছিলেন শুভ প্রভাতের সম্ভাবনা। যুদ্ধ তাঁর কাছে জড়তা ও অশুভ অন্ধকার থেকে মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছিল। রবীন্দ্রনাথ ইউরোপ-আমেরিকা ভ্রমণপর্বে ‘গীতাগুলি’র (১৯১০ খ্রিঃ) বাণী ও ভারতীয় অধ্যাত্মবাদের বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। তাই রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘সাধনা’ প্রকাশের মতোই প্রমথ…

  • সাহিত্য-টীকা-প্রাচীন · সূচনা

    প্রাকৃতপৈঙ্গল

    প্রাকৃতপৈঙ্গল প্রাকৃতপৈঙ্গল কী? ভাব, বিষয়বস্তু ও ভাষা-কৌশলের দিক থেকে এই গ্রন্থটি বাঙালী জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। গ্রন্থটি শৌরসেনী প্রাকৃত ও অপভ্রংশে লেখা হয়। বিভিন্ন কবি-রচিত শ্লোকের সঙ্কলন। সংকলকের নাম, পিঙ্গল। ইনি ‘পিঙ্গল ছন্দসূত্র‘ গ্রন্থাকার নন। পণ্ডিতজনের অনুমান, ১৪শ শতাব্দীতে কাশীধামে ‘প্রাকৃতপৈঙ্গল’ সঙ্কলিত হয়। এই গ্রন্থেও রাধা ও গােপালীলার উল্লেখ আছে, আছে বিভিন্ন দেবদেবীর…

  • ধর্মমঙ্গল · মঙ্গলকাব্য · মধ্যযুগ · সাহিত্য-টীকা-মধ্যযুগ

    রামাই পণ্ডিতের শূন্যপুরাণ

    রামাই পণ্ডিতের ‘শূন্যপুরাণ’  রামাই পণ্ডিতের শূন্যপুরাণ-আলোচনা বাংলা সাহিত্যের ধর্মমঙ্গল কাব্য প্রসঙ্গে হয়ে থাকে। ‘শূন্যপুরাণ’ বিষয়ে এই পোস্টে আলোচিত হবে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে  এর মুল্য রয়েছে। শূন্যপুরাণ সমস্যা রামাই পণ্ডিতের ‘শূন্যপুরাণ’-এর কাল নিয়ে কিছুটা সমস্যা দেখা দিয়েছিল। নগেন্দ্রনাথ বসু, দীনেশচন্দ্র সেন প্রমুখ গবেষকগণ শূন্যপুরাণের ভাষাকে খুব পুরানো বলে মনে করেছিলেন। রামাই পণ্ডিতকে তাঁরা দশম-একাদশ শতকের বলে…

  • সাহিত্য-টীকা-প্রাচীন · সূচনা

    রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজসভায় সাহিত্যচর্চা

    রাজা লক্ষ্মণ সেনের রাজসভায় সাহিত্যচর্চা লক্ষ্মণসেনের রাজসভায় ‘পঞ্চরত্ন’-এর সমাবেশ ঘটেছিল; এঁরা হলেন কবি জয়দেব, উমাপতি ধর, শরণ, ধোয়ী, গোবর্ধন আচার্য। জয়দেবের গীতগোবিন্দে’র প্রশস্তি-শ্লোক, সুভাষিতাবলীর (১৫শ শতাব্দী) শ্লোক এবং ‘বৈষণবতাষণী’ টীকা-গ্রন্থের সাক্ষ্যে মনে হয়, এঁরা ছিলেন সমসাময়িক। জয়দেবের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন স্বরাজ্যে সম্রাট। উমাপতি ধর উমাপতি ধরের কাব্যকলার পরিচয় বহন করছে দেওপাড়া এবং মাধাই…

  • জ্ঞানদাস

    কবি জ্ঞানদাস, 16শ শতকের কবি

    কবি জ্ঞানদাস, 16শ শতকের কবি, সাধারণ আলোচনা চৈতন্য-পরবর্তীকালের একজন সুবিখ্যাত বৈষ্ণব পদকর্তা জ্ঞানদাস। বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যে বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস ও গোবিন্দ দাস – এই চারজন কবিই প্রতিনিধি স্থানীয় কবি ও নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। জ্ঞানদাসের জীবন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তেমন কোনো আত্ম-পরিচয় তথ্য পাওয়া যায়নি। বর্ধমান জেলার কাটোয়ার নিকট কাঁদড়া গ্রামের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে আনুমানিক ১৫৩০…