আধুনিক-যুগ গদ্যের-সূচনা

বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ-এর গুরুত্ব

গভর্নর লর্ড ওয়েলেসলি ১৮০০ সালে যখন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ গড়ে তুললেন, তখন থেকে ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল বলা যায়। বাংলা সাহিত্যের প্রসারে এই কলেজের অবদান অনস্বীকার্য।

ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ

ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ

রাষ্ট্রশাসন পরিচালনের জন্য ইংরেজ সিভিলিয়ানদের ঔপনিবেশিক ভারতের ভাষা শিক্ষা করা একান্তভাবেই প্রয়োজন। কোম্পানি এই উদ্দেশ্যে কলকাতায় একটি কলেজ স্থাপন করলো ১৮০০ সালে। কোম্পানির উদ্দেশ্যের মধ্য রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্থা ব্যতীত অন্য কিছুই ছিল না। কিন্তু ইতিহাসের রথচক্র কোনো শাসকের প্রয়োজনকেই খাতির করে না। তাই এর কার্যধারা কলেজ কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনের সীমায় বদ্ধ রইল না। বাংলা গদ্যসাহিত্যের সৃষ্টিতে এই প্রতিষ্ঠান এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করল। এই কলেজটি হল ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ।

১৮০১ সালে উইলিয়াম কেরি এই কলেজে বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের ভার পেলেন। ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত এই কলেজটি তার উদ্দেশ্য পালন করে গিয়েছে। কিন্তু ১৮১৫ সালের পরে তার ইতিহাস গুরুত্ব হারিয়েছে। ১৮০১ – ১৮১৫ এই কয় বছর ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ বাংলা গদ্যসাহিত্যের ভিত্তি স্থাপন করে এদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছে। অবশ্য ১৮১৫ সালের পর রামমোহনের আবির্ভাবে এবং ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাইরেও নানাবিধ প্রতিষ্ঠান গদ্য-সাহিত্যের দায়িত্ব গ্রহণ করায় ভরকেন্দ্র ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ থেকে সরে গেল। অথচ বাংলায় গদ্যসাহিত্য রচনা করা এই কলেজের লক্ষ্য ছিল না, ছিল উপলক্ষ মাত্র। এই উপলক্ষই কিন্তু কলেজটিকে ইতিহাসের বুকে মর্যাদা দিয়েছে।

আরো পড়ুন--  অগ্নিবীণা 1922, কাজী নজরুল ইসলাম 

অবশ্য এর জন্য প্রথমেই কেরির ভূমিকার কথা স্মরণ করতে হয়। কেরি আগেই বাংলা গদ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন বাইবেলের অনুবাদ প্রসঙ্গে। বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে গদ্য-গ্রন্থের অভাব প্রথমেই তিনি লক্ষ করলেন। তিনি যে-সব পণ্ডিত ও মুনসিকে শিক্ষকরূপে নিযুক্ত করেছিলেন, তাঁদের সাহায্যে নিজে যেমন গদ্যগ্রন্থ সঙ্কলনের কাজে হাত দিলেন তেমনি তাঁদের স্বাধীনভাবে গ্রন্থ রচনায় উৎসাহিত করতে লাগলেন।

ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের লেখকদের মধ্যে প্রধান তিনজন স্বয়ং কেরি, প্রধান পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার এবং কেরির প্রাক্তন মুনশি রামরাম বসু। তাঁদের এবং অন্যান্য পণ্ডিতদের রচিত গ্রন্থগুলির একটি পূর্ণ তালিকা (১৮১৫ পর্যন্ত) দেওয়া হল—

আরো পড়ুন--  শনিবারের চিঠি 1924

১. রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র [রামরাম বসু ১৮০১]

২. থোপকথন [উইলিয়াম কেরি ১৮০১]

৩. হিতোপদেশ [গোলকনাথ শর্মা ১৮০২]

৪. বত্রিশ সিংহাসন [মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার ১৮০২]

৫. লিপিমালা [রামরাম বসু ১৮০২]

৬. ওরিয়েন্টাল ফেবুলিস্ট [তারিণীচরণ মিত্র ১৮০৩]

৭. মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়স্য চরিত্র [রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায় ১৮০৫]

৮. তোতা ইতিহাস [চণ্ডীচরণ মুনশী ১৮০৫]

৯. হিতোপদেশ [রামকিশোর তর্কচূড়ামণি ১৮০৮]

১০. হিতোপদেশ [মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার ১৮০৮]

১১. রাজাবলি  [মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার ১৮০৮]

১২. ইংরাজী-বাংলা শব্দকোষ [মোহনপ্রসাদ ঠাকুর]

১৩. ইতিহাসমালা [উইলিয়ম কেরি ১৮১২]

১৪. প্রবোধচন্দ্রিকা [মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার ১৮১৩ (পরে প্রকাশিত)]

১৫, পুরুষ পরীক্ষা [হরপ্রসাদ রায় ১৮১৫]

আরও দু-তিনখানি গ্রন্থ ফোর্ট উইলিয়ামের লেখকগোষ্ঠির দ্বারা রচিত ও প্রকাশিত হয়েছিল। গ্রন্থগুলি প্রধানত ইংরেজি, ফারসি বা সংস্কৃত গ্রন্থের অনুবাদ এবং আখ্যানধর্মী। কৃষ্ণচন্দ্রের জীবনীও প্রকৃত প্রস্তাবে গালগল্পের সংকলন। এই সব গ্রন্থের ভাষায় অকারণ সংস্কৃতাধিক্য এবং ফারসি শব্দের প্রয়োগ যেমন দৃষ্ট হয়, তেমনি দুরান্বয়, বিভক্তিযুক্ত পদ গঠনের ক্রটি লক্ষ করা যায়। ভাষা অনেকাংশে দুর্বোধ্য, প্রাণহীন ও কৃত্রিম। কিন্তু এর পূর্বে বাংলা গদ্যে যে সব পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে (মিশনারী প্রচেষ্টার কথা এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়) তার তুলনায় এঁদের ভাষা অনেক ভাল এবং প্রকৃত বাংলা ভাষার অনেক নিকটবর্তী। এদিক দিয়ে বিচার করলে এই লেখকদের সাধারণভাবে সাহিত্যিক বাংলা গদ্যের স্থাপয়িতার সম্মান দিতে হয়। কলেজের প্রধান তিনজন গ্রন্থকারকে ধরলে এ কথা নিঃসংশয়ে মেনে নিতে হয় যে, ফোর্ট উইলিয়ম কলেজই বাংলা সাহিত্যে গদ্যের প্রকৃত ভিত্তি স্থাপন করল। পূর্বোক্ত পণ্ডিতদের মধ্যে হরপ্রসাদ রায়, তারিণীচরণ মিত্র প্রভৃতির গ্রন্থ কলেজের বাইরেও বেশ কিছু জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। সম্ভবত এঁদের গল্পের নবীনতাই তার কারণ। সব দিক বিবেচনায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের মর্যাদা বাংলা গদ্য সাহিত্যের ইতিহাসে অবশ্যই স্বীকার্য।

আরো পড়ুন--  আনন্দমঠ 1882, উপন্যাস, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

সাহায্য- ক্ষেত্রগুপ্ত

Similar Posts

  • আধুনিক-যুগ · কথাসাহিত্য · সাহিত্য টীকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    ঐতিহাসিক উপন্যাস 1857, ভূদেব মুখোপাধ্যায়

    ঐতিহাসিক উপন্যাস 1857 : ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক কাহিনির সংকলন। দুটি কাহিনির সংকলন এই গ্রন্থটি। ঐতিহাসিক উপন্যাস 1857, ভূদেব মুখোপাধ্যায় [ক] ঐতিহাসিক উপন্যাস সংকলনের রচয়িতা ভূদেব মুখোপাধ্যায়।  [খ] প্রকৃতি = উপন্যাস।  [গ] ইতিহাসকে অবলম্বন করে ঐতিহাসিক কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে আলোচ্য উপন্যাসটি রচিত।  [ঘ] কণ্টারের লেখা ঐতিহাসিক গাল-গল্প সম্মলিত ‘Romance of History’-এর কাহিনীর উপর ভিত্তি করে…

  • আধুনিক-যুগ · গদ্যের-সূচনা

    রামরাম বসু ১৭৫৭-১৮১৩

    রামরাম বসু দীর্ঘকাল ইংরেজ মিশনারীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে কেরি সাহেবের বাংলা শিক্ষক এবং মুনসি হিসেবে তিনি শ্রীরামপুর মিশনে বেশ কিছুকাল অবস্থান করেছিলেন। মিশন-প্রচারিত গ্রন্থাবলীর অনুবাদ, রচনা ও সম্পাদনায় তাঁর কিছু ভূমিকা থাকা সম্ভব। অবশেষে তাঁর সাক্ষাৎ পাই ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের শিক্ষক হিসেবে। কেরির উৎসাহে তিনি বাংলা ভাষায় গ্রন্থ প্রণয়নে অগ্রসর হলেন। তাঁর ‘রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র’ ১৮০১ সালে মুদ্রিত…

  • আধুনিক-যুগ · পত্র-পত্রিকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    সম্বাদ প্রভাকর 1831

    সম্বাদ প্রভাকর ১৮৩১             সম্পাদক, প্রকাশকাল/আবির্ভাব :  সাপ্তাহিক ‘সম্বাদ প্রভাকর’ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সম্পাদনায় ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দের ২৮শে জানুয়ারি প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে ‘সম্বাদ প্রভাকরে’র মাসিক সংস্করণ প্রকাশিত হয়। শেষ পর্যন্ত ‘সম্বাদ প্রভাকর’ সাপ্তাহিক, মাসিক এবং দৈনিক প্রকাশিত হতে থাকে।   পরিচিতি:  ‘সম্বাদ প্রভাকর’ সপ্তাহে তিনবার প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকা প্রথম…

  • সাহিত্য-টীকা-আধুনিক · কাব্য কবিতা

    অগ্নিবীণা ১৯২২ খ্রি.

    অগ্নিবীণা (১৯২২ খ্রি.) কবি = কাজী নজরুল ইসলাম। প্রকৃতি = কাব্যগ্রন্থ। মূল বিষয় = বিংশ শতকের প্রথম দুই দশকে ভারতবর্ষে নতুন জীবন, নতুন সম্ভাবনার অভিব্যক্তি ও দেশাত্মবোধ এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলিতে প্রকাশিত। বৈশিষ্ট্য ও বিশেষ কথা = ‘অগ্নিবীণা’ নজরুলের প্রথম ও প্রধান কাব্যগ্রন্থ। = নজরুলের বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা এই কাব্যের অন্তর্গত। = গ্রন্থটিতে মোট বারটি (১২টি)…

  • আধুনিক-যুগ · পত্র-পত্রিকা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    সম্বাদ কৌমুদী 1821

    সম্বাদ কৌমুদী ১৮২১         প্রকাশকাল/আবির্ভাব :  সমাচার দর্পণে প্রায়ই হিন্দুধর্ম ও সমাজকে অকারণে গালিগালাজ করা হত। এর প্রতিবিধান করবার জন্য ১৮২১ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর রাজা রামমোহন রায় ও ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘সম্বাদ কৌমুদী’ পত্রিকাটি প্রকাশ করে ‘সমাচার দর্পণে’ প্রকাশিত মিশনারীদের হিন্দুধর্মের প্রতি আক্রমণের যথোপযুক্ত জবাব দেন।   সম্পাদক/পরিচিতি :  সম্বাদ কৌমুদীর প্রথম সম্পাদক…

  • গদ্যের-সূচনা · সাহিত্য-টীকা-আধুনিক

    ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কলিকাতা কমলালয়’ 1823

    ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কলিকাতা কমলালয়’ 1823 : ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কলিকাতা কমলালয়’ (১৮২৩) বাংলা গদ্যসাহিত্যের আদি যুগের একটি অমূল্য নিদর্শন। ‘নকশা’ জাতীয় রচনার প্রবর্তক হিসেবে ভবানীচরণ এই গ্রন্থে সেকালের কলকাতার যে সমাজচিত্র এঁকেছেন, তা আজও গবেষকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কলিকাতা কমলালয়’ 1823 : সেকালের কলকাতার সমাজ-দর্পণ ## পটভূমি ও বিষয়বস্তু উনিশ শতকের শুরুতে কলকাতা যখন…