তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কালান্তর’ 1956

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কালান্তর’ 1956: তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কালান্তর’ (১৯৫৬) উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথের ‘কালান্তর’ যেখানে ছিল প্রবন্ধ সংকলন, তারাশঙ্করের ‘কালান্তর’ সেখানে একটি আত্মজৈবনিক উপন্যাস, যা ব্যক্তি ও সমাজের পরিবর্তনের এক কালানুক্রমিক দলিল।


তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কালান্তর’ 1956 : অবক্ষয়িত গ্রাম ও ব্যক্তি-জীবনের সন্ধিক্ষণ


## উপন্যাসের পটভূমি ও চরিত্রায়ন

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা ও ছদ্মনামের আশ্রয়ে এই উপন্যাসটি রচনা করেছেন। উপন্যাসের নায়ক গৌরীকান্ত মূলত লেখকেরই প্রতিচ্ছবি। একদা গ্রাম থেকে বিতাড়িত গৌরীকান্ত যখন সাহিত্যের যশ ও খ্যাতি নিয়ে স্বাধীনতার পরবর্তী প্রথম নববর্ষে গ্রামে ফেরেন, তখন তাঁর চোখে ধরা পড়ে গ্রাম ও সমাজের এক আমূল পরিবর্তন বা ‘কালান্তর’।

## মূল বিষয়বস্তু: স্মৃতি ও বর্তমানের সংঘাত

উপন্যাসটির মূল ভিত্তি হলো স্মৃতিচারণ। গৌরীকান্তের গ্রামে ফেরার মাধ্যমে অতীতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা উঠে আসে:

  • বিশ্বেশ্বরীর প্রতি আকর্ষণ: কিশোর গৌরীকান্তের সাহিত্যের প্রতি অনুরাগের মূলে ছিল বিশ্বেশ্বরীর প্রভাব।
  • ট্র্যাজেডি ও বহিষ্কার: বিশ্বেশ্বরীর আত্মহত্যা এবং তাকে কেন্দ্র করে রক্ষণশীল গ্রামসমাজে যে আলোড়ন তৈরি হয়, তার ফলেই গৌরীকান্তকে গ্রাম থেকে বহিষ্কৃত হতে হয়েছিল।
আরো পড়ুন--  অশ্রুকণা ১৮৮৭ খ্রি

## সমাজতাত্ত্বিক ও দার্শনিক দ্বান্দ্বিকতা

উপন্যাসটিতে তারাশঙ্কর দুটি পরস্পরবিরোধী আদর্শের সংঘাত দেখিয়েছেন, যা সমকালীন ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার প্রতিফলন:

১. উগ্র বিপ্লববাদী ও নাস্তিক্য দর্শন: যার প্রতিনিধি হলেন কপিলদেব। তিনি প্রথাগত সমাজ ও ধর্মের আমূল পরিবর্তনের পক্ষপাতী।

২. প্রাচীনপন্থী রক্ষণশীলতা: যার প্রতিনিধি সন্তোষ মুখোপাধ্যায়। তিনি কৌলিন্য প্রথা ও প্রাচীন সমাজবিন্যাসকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চান।

## চরিত্রের বৈচিত্র্য

উপন্যাসে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের উপস্থিতি একে একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক রূপ দিয়েছে:

  • বিজয়: গৌরীকান্তের হঠকারী জ্ঞাতি-ভ্রাতা।
  • মহাদেব সরকার: গ্রাম্য ঈর্ষা ও বিশ্বনিন্দুক চরিত্রের প্রতীক।
  • রামহরি চক্রবর্তী: নিম্নশ্রেণীর ব্রাহ্মণ ও ধর্মরাজের পুরোহিত, যার মাধ্যমে বর্ণপ্রথার জটিলতা প্রকাশিত।
  • শান্তি ও রমা: নারী চরিত্রের মধ্য দিয়ে প্রগতিশীল চিন্তার প্রকাশ ঘটেছে। শান্তির বামপন্থী আদর্শ ও কপিলদেবের প্রতি তার আনুগত্য উল্লেখযোগ্য।
আরো পড়ুন--  অশনি সংকেত ১৯৫৯ খ্রি.

## উপন্যাসের পরিণতি: মিলন ও মৃত্যু

উপন্যাসের শেষে দুটি নাটকীয় এবং অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে যা পাঠককে চমকে দেয়:

  • গৌরীকান্ত ও শান্তির মিলন: যা মানবিক সম্পর্কের এক নতুন মাত্রা যোগ করে।
  • কপিলদেবের সহিংস রূপ: কিশোর বাবুকে গুলিবিদ্ধ করার মাধ্যমে উগ্র বিপ্লববাদের করুণ ও হিংস্র দিকটি উন্মোচিত হয়।

## মূল্যায়ন: শক্তি ও দুর্বলতা

‘কালান্তর’ উপন্যাসটি তারাশঙ্করের আত্মজীবনমূলক রচনার এক অনন্য নিদর্শন।

  • শক্তি: স্বগ্রাম ও সমাজের নিপুণ বর্ণনা এবং কৌলিন্য প্রথার যে ব্যবচ্ছেদ তিনি করেছেন, তা সমাজতাত্ত্বিক দিক থেকে অত্যন্ত মূল্যবান।
  • দুর্বলতা: কোনো কোনো সমালোচকের মতে, আত্মজীবনীর প্রভাব বেশি থাকায় উপন্যাসের শিল্পগত সুষমা মাঝে মাঝে ব্যাহত হয়েছে। তবে গ্রাম্য জীবনের বিপর্যয় দর্শনে লেখকের যে ‘অভিভূত’ হওয়া, তা পাঠককে নাড়া দেয়।
আরো পড়ুন--  একেই কি বলে সভ্যতা 1860, মধুসূদন দত্ত, প্রহসন

সংক্ষেপে: তারাশঙ্করের ‘কালান্তর’ হলো একটি ক্রান্তিকালের আখ্যান। প্রাচীন আভিজাত্য চূর্ণ হওয়া এবং নতুন রাজনৈতিক মতাদর্শের উত্থানের মাঝে পড়ে গ্রাম্য সমাজের যে চেনা রূপটি হারিয়ে যাচ্ছিল, লেখক গৌরীকান্তের মাধ্যমে তাকেই চিরস্থায়ী রূপ দিয়েছেন।

error: সংরক্ষিত !!
Scroll to Top