ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কলিকাতা কমলালয়’ 1823 : ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কলিকাতা কমলালয়’ (১৮২৩) বাংলা গদ্যসাহিত্যের আদি যুগের একটি অমূল্য নিদর্শন। ‘নকশা’ জাতীয় রচনার প্রবর্তক হিসেবে ভবানীচরণ এই গ্রন্থে সেকালের কলকাতার যে সমাজচিত্র এঁকেছেন, তা আজও গবেষকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কলিকাতা কমলালয়’ 1823 : সেকালের কলকাতার সমাজ-দর্পণ
## পটভূমি ও বিষয়বস্তু
উনিশ শতকের শুরুতে কলকাতা যখন ‘আজব শহর’ হিসেবে গড়ে উঠছে, সেই সময়কার নাগরিক জীবনের রূপরেখা নিয়ে রচিত এই গ্রন্থ। এখানে একজন বিদেশি (গ্রাম থেকে আসা আগন্তুক) এবং একজন নগরবাসীর (কলকাতার অভিজ্ঞ ব্যক্তি) প্রশ্নোত্তর ও কথোপকথনের মাধ্যমে কলকাতার বিচিত্র সমাজজীবন বর্ণিত হয়েছে। কলকাতার ধনী ‘বাবু’ সমাজ এবং মধ্যবিত্তদের আচার-আচরণই এই নকশার মূল উপজীব্য।
## উপস্থাপন রীতি ও সামাজিক চিত্র
গ্রন্থটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর মনোগ্রাহী উপস্থাপন রীতি। টুকরো টুকরো প্রশ্নের মাধ্যমে লেখক তৎকালীন কলকাতার অনেক অজানা দিক উন্মোচন করেছেন:
- শিক্ষাব্যবস্থা: কলকাতার তৎকালীন পাঠশালা এবং স্কুলগুলোতে বিদ্যাশিক্ষার প্রকৃত হাল কেমন ছিল, তার একটি স্বচ্ছ ধারণা এখান থেকে পাওয়া যায়।
- বাবু সংস্কৃতি: ধনী বাবুদের জীবনধারা এবং তাদের ঘিরে থাকা মোসাহেবদের বিচিত্র কর্মকাণ্ডের নিপুণ বর্ণনা এতে রয়েছে।
- আচার-আচরণ: মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকদের বাহ্যিক পরিপাটি ভাব এবং অভ্যন্তরীণ সংকট—উভয় দিকই জিজ্ঞাসার ছলে উঠে এসেছে।
## ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপের শৈলী
ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদ্রূপের একটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। সমালোচকদের ভাষায়:
- নির্মল হাস্যরস: তাঁর বিদ্রূপ তীক্ষ্ণ হলেও তা নিষ্ঠুর বা ক্ষমাহীন নয়। তিনি সমাজকে শাসন করার চেয়ে ‘রসানুর’ বা রসের মাধ্যমে সংশোধন করার দিকেই বেশি নজর দিয়েছেন।
- রসাত্মক ভঙ্গি: তিনি নিজেকে শিক্ষকের (মাস্টার) আসনে না বসিয়ে একজন রসিক পর্যবেক্ষকের আসনে বসিয়েছেন। ফলে বিদ্রূপের দাহ বা জ্বালা তাঁর হাস্যরসকে শুষ্ক করে ফেলেনি।
## সাহিত্যিক সীমাবদ্ধতা ও গুরুত্ব
গ্রন্থটির একটি সীমাবদ্ধতা হলো লেখক এখানে সমাজের ‘বহিরঙ্গের’ বা বাইরের দিকের ওপর বেশি আলোকপাত করেছেন।
পর্যবেক্ষণ: লেখক যদি তৎকালীন সমাজের গভীরে প্রবেশ করে মানুষের মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকটের দিকে নজর দিতেন, তবে এই নকশা জাতীয় আখ্যানটি কেবল একটি বর্ণনা না হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক দলিলে পরিণত হতে পারতো।
তবুও, বাংলা গদ্যের বিকাশে এবং ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’র মতো পরবর্তীকালীন সামাজিক নকশাগুলোর পূর্বসূরি হিসেবে ‘কলিকাতা কমলালয়’ এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম।
## একনজরে গ্রন্থটি
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
| রচনাকাল | ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দ |
| ধরন | নকশা জাতীয় ব্যঙ্গাত্মক আখ্যান |
| গঠন | বিদেশি ও নগরবাসীর প্রশ্নোত্তর |
| মূল লক্ষ্য | কলকাতার ধনী ও মধ্যবিত্ত সমাজের সংস্কার |
| প্রধান সুর | পরিহাস ও নির্মল কৌতুক |