মন্মথ রায়ের ‘কারাগার’ 1930

মন্মথ রায়ের ‘কারাগার’ 1930 : মন্মথ রায়ের ‘কারাগার’ (১৯৩০) নাটকটি বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য সংযোজন। পৌরাণিক আখ্যানের আড়ালে সমকালীন স্বদেশী আন্দোলন এবং ব্রিটিশ বিরোধী চেতনাকে তিনি যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা অতুলনীয়। আপনার দেওয়া তথ্যগুলোর ওপর ভিত্তি করে লেখাটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুন্দর প্রবন্ধ বা আলোচনার আকারে নিচে সাজিয়ে দেওয়া হলো:


মন্মথ রায়ের ‘কারাগার’ 1930: পৌরাণিক পটভূমিকায় সমকালীন মুক্তিগাথা

## সূচনাবন্ধ

১৯৩০ সালের ২৪ শে ডিসেম্বর কলকাতার মনমোহন থিয়েটারে প্রথম মঞ্চস্থ হয় নাট্যকার মন্মথ রায়ের কালজয়ী নাটক ‘কারাগার’। এটি মূলত একটি পৌরাণিক নাটক হলেও এর পরতে পরতে মিশে আছে প্রখর দেশাত্মবোধ। শ্রীমদভাগবত পুরাণের নবম স্কন্দের শেষাংশ ও দশম স্কন্দের প্রথমাংশ থেকে নাটকের কাহিনী গৃহীত হলেও, নাট্যকার একে সমকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

## নাটকের মূল প্রেক্ষাপট ও রূপক ব্যঞ্জনা

নাটকের কাহিনী আবর্তিত হয়েছে ভোজ বংশের অত্যাচারী রাজা কংসকে কেন্দ্র করে। কংস তার পিতা উগ্রসেনকে সিংহাসনচ্যুত করে এবং যাদবদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন শুরু করে। এই অসহায় অবস্থায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কারাগারে আবির্ভূত হন কংসের বিনাশ ও ধর্ম সংস্থাপনের জন্য।

আরো পড়ুন--  কপালকুণ্ডলা 1866, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, উপন্যাস

নাট্যকার নিজেই মন্তব্য করেছিলেন:

“যে কারাগারে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল সেই কারাগারেই আজও উদিত হবে আমাদের জাতীয় জীবনের স্বাধীনতার সূর্য। চল সব সেই মহা তীর্থে…”

এই বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, নাটকের কংস চরিত্রটি আসলে অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসকের প্রতীক এবং নির্যাতিত যাদবকুল হলো পরাধীন ভারতবাসীর প্রতিচ্ছবি।


## ‘নীলদর্পণ’ ও ‘কারাগার’-এর তুলনা

দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ নাটকে সমকালীন বাংলাদেশের নীলকরদের অত্যাচারের চিত্র সরাসরি ফুটে উঠেছিল। কিন্তু মন্মথ রায় ‘কারাগার’ নাটকে সেই পরাধীনতার জ্বালা ও রাজনৈতিক অসহায়তাকে সরাসরি প্রকাশ না করে পুরাণের আবরণে পরিবেশন করেছেন। এটি ছিল সেন্সরশিপ বা রাজরোষ থেকে বাঁচার এক কৌশল, যা সাধারণ মানুষের মনে স্বাধীনতার স্পৃহা জোগাতে আরও বেশি সক্ষম হয়েছিল।


## কারাগারের দ্বৈত রূপ

নাটকে দুটি ভিন্ন কারাগারের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা নাটকের গভীরতাকে বাড়িয়ে দেয়:

আরো পড়ুন--  একেই কি বলে সভ্যতা 1860, মধুসূদন দত্ত, প্রহসন

১. পাষাণ কারাগার: এখানে আলো-বাতাসহীন পরিবেশে বন্দী রাখা হয় কঙ্কণ, কঙ্কা, অঞ্জনা ও শিশু রঞ্জনকে। অনাহারে-অর্ধাহারে তাদের মৃত্যু এবং নারায়ন মূর্তির বন্দিত্ব ব্রিটিশ শাসনের নিষ্ঠুরতম কারাগারের প্রতীক।

২. লৌহ কারাগার: এখানে বন্দী ছিলেন বসুদেব ও দেবকী। এই কারাগারেই শৃঙ্খল ভেঙে আবির্ভূত হন ত্রাণকর্তা শ্রীকৃষ্ণ।


## চরিত্র বিশ্লেষণ

  • বসুদেব (নায়ক): নাটকের প্রধান নিয়ন্ত্রক শক্তি হলেন বসুদেব। তিনি কেবল একজন বন্দী পিতা নন, বরং কংসের দানবতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং ভোজ রাজত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রধান কারিগর। তার ধৈর্য ও নেতৃত্বই নাটকের মূল চালিকাশক্তি।
  • চন্দনা: নাটকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারী চরিত্র। দেশের স্বার্থে এবং জাতির জনক বসুদেবকে রক্ষা করতে সে কংসের হাতে নিজের সর্বস্ব বা ‘নারী ধর্ম’ বিসর্জন দিতে দ্বিধা করেনি। তার এই তিতিক্ষা দেশপ্রেমের এক চরম নিদর্শন।
  • কংস: পিতা উগ্রসেনের ভাষায় সে এক ‘কুলাঙ্গার পুত্র’, যে বিজয় ও শক্তির মোহে অন্ধ হয়ে নিজের বংশ ও ধর্মকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।
আরো পড়ুন--  দিগদর্শন পত্রিকা 1818

## নাট্যগঠন ও নামকরণ

পাঁচটি অংকে বিন্যস্ত এই নাটকের মূল স্তরগুলি হলো—কারাগারে বসুদেবের বন্দিত্ব, কংসের নিষ্ঠুরতা ও চন্দনার প্রতি তার আসক্তি এবং পরিশেষে কংস নিধনে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব।

নামকরণ:

নাটকটির নামকরণ ‘কারাগার’ সার্থক ও তাৎপর্যপূর্ণ। কারাগার এখানে কেবল শৃঙ্খলের প্রতীক নয়, বরং তা নবজন্ম ও শক্তির উৎসস্থল। “কারার ঐ লৌহ কপাট” ভেঙে ফেলবার যে মন্ত্র ও দেশাত্মবোধের আবেগ নাট্যকার জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন, তারই সার্থক প্রতিফলন ঘটেছে এই নামকরণে।


## উপসংহার

মন্মথ রায়ের ‘কারাগার’ কেবল একটি থিয়েটার বা অভিনয় ছিল না, এটি ছিল পরাধীন ভারতের মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ের গর্জন। পৌরাণিক কাহিনীর আশ্রয়ে পরাধীনতার অন্ধকার থেকে স্বাধীনতার আলোর পথে যাত্রার এই বার্তা নাটকটিকে বাংলা সাহিত্যের এক অক্ষয় কীর্তিতে পরিণত করেছে।

error: সংরক্ষিত !!
Scroll to Top