চণ্ডীদাস

পদাবলির কবি চণ্ডীদাস, 15শ শতকের কবি

পদাবলির কবি চণ্ডীদাস

পদাবলির কবি চণ্ডীদাস, 15শ শতকের কবি

ভূমিকা


চৈতন্য-পূর্ব যুগে বিদ্যাপতির সমসাময়িক একজন শ্রেষ্ঠ রাধাকৃষ্ণ পদাবলী রচয়িতা কবি চণ্ডীদাস। বাংলা ভাষায় তিনি প্রথম পদাবলী রচনা করেন। তাই তাঁকে সাধারণভাবে পদকর্তা চণ্ডীদাস বলা হয়। কিন্তু চণ্ডীদাসকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে জটিল সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। চণ্ডীদাস নামধারী অন্তত চারজন কবি ছিলেন বলে পণ্ডিতরা নানা তথ্য বা উপাদানকে কেন্দ্র করে চণ্ডীদাস সমস্যার সমাধানে প্রয়াসী হয়েছেন। বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যে চণ্ডীদাসের স্থান অতি উচ্চ। অল্পকথায়, সহজ ও অনলংকৃত ভাষায় তাঁর পদে প্রেমানুভূতির গভীরতা ও আন্তরিকতা ফুটে উঠেছে।

পদাবলির কবি চণ্ডীদাস : পরিচয়


চণ্ডীদাসের ব্যক্তিপরিচয় তেমন কিছু জানা যায় না। জনশ্রুতি অনুসারে তিনি বীরভূম জেলার নান্নুর গ্রামে বাস করতেন। জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন। প্রথমে বাশুলী বা চণ্ডীর উপাসক হলেও পরে সহজ মার্গের সাধনায় ব্রতী হন। ইনি রামী নামে এক রজক কন্যাকে সাধনসঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করেন। রজকিনী রামীর কথা কোনো কোনো পদে পাওয়া যায়। যেমন একটি দৃষ্টান্ত – “রাজকিনী প্রেম । নিকষিত হেম। কামগন্ধ নাহি তায়।” কথিত আছে যে চণ্ডীদাস এক রাজার ক্রোধে পতিত হন এবং হস্তিপদতলে দলিতপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারান।

আরো পড়ুন--  কবি গোবিন্দদাস, 16শ শতকের কবি

পদাবলির কবি চণ্ডীদাস : সাধারণ আলোচনা


চণ্ডীদাসের পদাবলীর রাধা এক সূক্ষ্মভাবের জ্যোতির্ময়ী বিগ্রহ। জন্ম থেকেই তিনি কৃষ্ণপ্রেমে উন্মাদিনী। জন্মা-জন্মান্তরে তিনি কৃষ্ণগতপ্রাণা-দুঃখ বেদনায় আধ্যাত্মিক জগতের অভিযাত্রী। তাই চণ্ডীদাসের রাধা চরিত্রে কোনো ক্রমবিকাশ নেই। পূর্বরাগ, অনুরাগ, বিরহ ও মিলন প্রভৃতি বিচিত্র পর্যায়ের পদ চণ্ডীদাস লিখলেও সব পদেই প্রেমানুভূতিতে বিরহ প্রবল। চণ্ডীদাস বেদনার কবি, আক্ষেপানুরাগের কবি। বয়সের দিক থেকে রাধা ক্রমবিকশিত নন। দেহধর্ম ও যৌবনধর্ম বা ইন্দ্রিয় বোধ নয়-হৃদয়ের এক গভীর ব্যাকুলতায় রাধার প্রধান পরিচয়। 

রাধা সব বাসনা কামনা ও সৌন্দর্য চেতনা মিশিয়ে কৃষ্ণকে তৈরী করেছেন। কৃষ্ণ তার মনের মানুষ। কৃষ্ণনাম জপ করতে করতে তাঁর প্রাণ অবশ হয়ে যায়–তিনি প্রণয় মিলন ও প্রণয় বিরহের এক অপূর্ব সৌন্দর্যময় রোমান্টিক রাজ্যে গিয়ে হাজির হন। দেহকেন্দ্রিক মিলন বা প্রেমরঙ্গলীলার তরঙ্গ বিক্ষোভ চণ্ডীদাসের পদে নেই। তাঁর রাধাকৃষ্ণের প্রেম ও মিলনের বর্ণনায় রবীন্দ্রনাথের ভাষায় দেহহীন চামেলির লাবণ্য বিলাসের বেদনাবিধুর অনুরাগ ফুটে উঠেছে। চণ্ডীদাস দেহের কবি নন, দৈহিক মিলনানন্দের কবি নন। অবশ্য চণ্ডীদাসের পদে দেহ সৌন্দর্যের কিছু কিছু বর্ণনা আছে। সেগুলি রাধার দেহলাবণ্যে আকৃষ্ট মুগ্ধ শ্রীকৃষ্ণের উক্তি।

আরো পড়ুন--  অষ্টাদশ শতাব্দীর বৈষ্ণব পদ সংকলন গ্রন্থ

রবীন্দ্রনাথ চণ্ডীদাসের পদাবলী আলোচনা করতে গিয়ে রাধার প্রেম সাধনাকে গুরুগ দিয়েছেন। তাঁর মতে, “চণ্ডীদাস সহজভাষার সহজভাবের কবি-এই গুণে তিনি বঙ্গীয় প্রাচীন কবিদের মধ্যে প্রধান কবি।”

চণ্ডীদাসের কবিতায় রাধার যে প্রেম তা এক গভীরতম জীবনবোধের নির্যাস। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, চণ্ডীদাস দুঃখের কবি। দুঃখবোধের নিবিড়তার মধ্য দিয়েই চণ্ডীদাসের পদাবলীতে প্রেমের জগৎ তৈরী হয়েছে। চণ্ডীদাস দুঃখের মধ্যে সুখ ও সুখের মধ্যে দুঃখকে প্রত্যক্ষ করেছেন। তাঁর রাধা প্রেমের সাধনায় ব্যাকুল ও গভীর। চরম ও পরম কিছুকে পেতে হলে অজস্র দুঃখ বেদনার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়। চণ্ডীদাসের রাধা জানেন, “সত্য যে কঠিন” ; কিন্তু তাকে ভালবাসলে সেই কঠিন কখনো কাউকে বঞ্চনা করে না।

চণ্ডীদাসের রাধা জানেন – “সুখের লাগিয়া/যে করে পীরিতি/দুঃখ যায় তার ঠাঁই।” পীরিতি করতে গেলে দুঃখ অনিবার্য। তাই বলে প্রেমকে পরিত্যাগ করা যায় না। কঠোর দুঃখের সাধনায় প্রেমের স্বর্গীয় দ্যুতি ফুটে উঠে। এটা উপলব্ধির ব্যাপার–কথায় ব্যাখ্যা করা যায় না। চণ্ডীদাসের পদাবলীতে প্রেমের শ্রেয়োবোধ অপার্থিব রসলোক সৃষ্টি করেছে। সেখানে উপভোগের কামগন্ধ নেই। আছে আত্মানুভূতির নিবিড় আনন্দ। চণ্ডীদাসের পদে দেহ ও রূপসৌন্দর্যের দিকটা যথেষ্ট উপেক্ষিত বলে তার আধ্যাত্মিক ভাবুকতা সকলের চিত্তকে আকৃষ্ট করে।

আরো পড়ুন--  বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাপতি সমস্যা, Discuss with best unique 3 points

এই যে প্রেমের সাধনা তা প্রকৃতপক্ষে ‘বড় আমি’র সাধনা। সেই সাধনায় কুলশীল, জাতিমান সব পরিত্যাগ করতে হয়–পরকে আপন করতে হয় ও আপনকে পর করতে হয়। পদে পদে রক্তের পদচিহ্ন এঁকে কুল খোয়ানো অভিসার যাত্রায় বেরিয়ে পড়তে হয়। এমন কি প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিতে হয় –

চণ্ডীদাস বলে শুন বিনোদিনী

পীরিতি না কহে কথা।

পীরিতি লাগিয়া পরাণ ছাড়িলে

পীরিতি মিলয়ে তথা।

Similar Posts

  • কাব্য কবিতা

    ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ১৮১২-১৮৫৯

    ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ১৮১২-১৮৫৯) ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ তথা ভারতচন্দ্রের মৃত্যুর পর তেমন কোন পালাবদলের ইঙ্গিত বাংলা কাব্যসাহিত্যে ফুটে ওঠেনি। ভারতচন্দ্রীয় আদিরসের ফেনিল উচ্ছ্বাস, আর কবিওয়ালাদের উচ্চকিত উল্লাস বাংলা সাহিত্যে শুধুমাত্র সামান্য পরিবর্তনের রেশ এনেছিল। তারপর রঙ্গলাল এসে ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে সর্বপ্রথম নতুন কাব্যবস্তুর নান্দীপাঠ করলেন। মধুসূদন নতুন নতুন কুশীলব নিয়ে শুরু করলেন তাঁর রচনা। সেই সময়…

  • গোবিন্দদাস

    কবি গোবিন্দদাস, 16শ শতকের কবি

    কবি গোবিন্দদাস, 16শ শতকের কবি, সাধারণ আলোচনা সূচনা চৈতন্যোত্তর পদাবলী সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি গোবিন্দদাস। সংস্কৃত অলংকার শাস্ত্রে ও বৈষ্ণবীয় দর্শনে সুপণ্ডিত গোবিন্দদাস বিধিদত্ত কবিপ্রতিভার সাহায্যে ছন্দসংগীতের বাণীশিল্পে যে অপূর্ব সৌন্দর্যের জগৎ সৃষ্টি করেছেন সেক্ষেত্রে তিনি জয়দেব-বিদ্যাপতি–ভারতচন্দ্রের সমগোত্রীয়। কিন্তু কাব্যাদর্শের দিক থেকে তিনি বিদ্যাপতিকে বিশেষভাবে অনুসরণ করেছেন। তাই বিদ্যাপতির সঙ্গে তাঁর ভাবগত আত্ময়ীতা বেশি। বিদ্যাপতির অনেক…

  • অন্যান্য-বৈষ্ণবসাহিত্য

    অষ্টাদশ শতাব্দীর বৈষ্ণব পদ সংকলন গ্রন্থ

    বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের (প্রাগাধুনিক পর্যায়) বৈষ্ণব সাহিত্যের আলোচনায় বৈষ্ণবপদ সংকলন গ্রন্থের প্রসঙ্গ আলোচনা অবশ্য কর্তব্য। এই লেখায় উল্লেখযোগ্য পদসংকলন গ্রন্থের সাধারণ আলোচনার পাশাপাশি অপ্রধান কিছু সংকলন গ্রন্থের আলোচনাও সংযোজিত হয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর বৈষ্ণব পদ সংকলন গ্রন্থ সাধারণ আলোচনা মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের প্রচারিত বৈষ্ণবীয় প্রেমধর্মের প্রভাবে বাংলার রাষ্ট্র ও সমাজজীবনে এবং বাংলা সাহিত্যে বিরাট এক পরিবর্তন সূচিত…

  • ইসলামী বাংলা সাহিত্য

    শাহ মুহম্মদ সগির এবং ইউসুফ জোলেখা

    শাহ মুহম্মদ সগির এবং ইউসুফ জোলেখা ভূমিকা শাহ মুহম্মদ সগির পঞ্চদশ শতকের দ্বিতীয় অর্ধে তাঁর কাব্য রচনা করেন। ইউসুফ জোলেখা বাংলা ইসলামী সাহিত্যের লিখিত কাব্যের মধ্যে সবচেয়ে পুরনো। অনেক প্রাচীন গ্রন্থে এই প্রণয় কাহিনী আছে। কবি ঠিক অনুবাদ করেননি। লোকশ্রুতি থেকে কাহিনী কাঠামোটি সংগ্রহ করে নিজের মতো বদলে নিয়েছেন। নতুন গল্প ও বর্ণনা আছে। পরিবেশ…

  • বিদ্যাপতি

    কবি বিদ্যাপতির ধর্ম, Discuss with best 3 unique points

    বিদ্যাপতিকে অনেকে বলে থাকে তিনি পঞ্চোপাসক। একজন কবির ধর্ম বিষয়ে পাঠকের কৌতূহল থাকবে তা স্বাভাবিক। এখানে বিদ্যাপতির ধর্ম পরিচয় সম্বন্ধে কিছু আলোচনা করা হল। বিদ্যাপতির ধর্ম ভূমিকা বিচিত্র বিষয়কে অবলম্বন করে বিদ্যাপতির কবিপ্রতিভার অভিব্যক্তি ঘটেছে। তিনি হরি, হর, দুর্গা, কালী ও রাম-সীতা বিষয়ে পদাবলী রচনা করেছেন। বাংলাদেশে বিদ্যাপতির জনপ্রিয়তা রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলীর জন্য। স্বয়ং মহাপ্রভু…

  • বিদ্যাপতি

    বিদ্যাপতির জীবন ইতিহাস, Best unique 7 points

    মৈথিল কোকিল বিদ্যাপতির জীবনের নানাদিক নিয়ে এই লেখাটি প্রস্তুত করা হয়েছে। বৈষ্ণব সাহিত্যের শিরোমণি বিদ্যাপতির ব্যক্তিগত জীবনের যতখানি তথ্য এখন জানা সম্ভব তা সংক্ষেপে এখানে উল্লিখিত হল। বিদ্যাপতির জীবন ইতিহাস শুরুর কথা মিথিলার কবি হওয়া সত্ত্বেও বিদ্যাপতি বাঙালির জীবন ও সাধনার সঙ্গে গভীর আত্মীয়তার সূত্রে আবদ্ধ। বিদ্যাপতিকে বাঙালি পরম শ্রদ্ধা-সহকারে বরণ করে নিয়েছে। তাঁর কবিতাবলীর…