অন্যান্য বৈষ্ণবকবি

বৈষ্ণব কবি রায়শেখর, 16শ শতকের কবি

কবি রায়শেখর
কবি রায়শেখর

বৈষ্ণব কবি রায়শেখর, 16শ শতকের কবি, সাধারণ আলোচনা

পরিচয়

ষোড়শ শতকের শেষভাগে যে সকল পদকর্তা বর্তমান ছিলেন তাঁদের মধ্যে রায়শেখর অন্যতম। তিনি বৈষ্ণব পদাবলী ছাড়া ‘গোপাল বিজয়‘ নামক বাংলা কাব্য এবং একাধিক সংস্কৃত কাব্য রচনা করেন। গোপাল বিজয়ের আত্মপরিচয় দান প্রসঙ্গে কবি জানিয়েছেন যে, তাঁর পৈতৃক নাম দৈবকীনন্দন সিংহ, পিতার নাম চতুর্ভুজ, তিনি লিখেছেন –

“সিংহ বংশে জন্ম নাম দৈবকীনন্দন।

শ্রীকবিশেখর নাম বলে সর্বজন।।”

কিন্তু লক্ষিতব্য বিষয় এই যে, বৈষ্ণব পদাবলীর উণিতায় রায়শেখর, কবিশেখর, শেখর, শেখর রায়, শেখর দাস ও নব কবিশেখর প্রভৃতি বহু উপাধি বা উপনাম ব্যবহার করেছেন। ফলে তাঁর ভণিতা নিয়ে নানা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে এবং কবি প্রতিভার স্বরূপ সম্পর্কেও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। 

সংশয়

ক’জন শেখর পদাবলী রচনা করেন সে সম্পর্কে এখনও সংশয় রয়েছে। তবে গোবিন্দদাসের পর রায়শেখর ভণিতা দিয়ে যিনি বাংলা ও ব্রজবুলিতে বৈষ্ণবপদ লিখে খ্যাতি লাভ করেন তিনি একক মহিমায় বিরাজমান। ব্রজবুলি পদ রচনায় রায়শেখর যথেষ্ট কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। ড. সুকুমার সেনের মতে, ব্রজবুলি ভাষায় কবিতা রচনার দক্ষতায় গোবিন্দদাসের পরই কবিরঞ্জন এবং রায়শেখরের নাম করতে হয়।

পদকল্পতরু‘তে রায়শেখর ভণিতার ৩৫টি পদ পাওয়া গেছে। অন্যান্য ভণিতায় ১৪৪টি পদ। সব ভণিতার মোট পদ সংখ্যা ১৭৯টি। ব্রজবুলিতে রচিত পদসংখ্যা ৯০টি। অবশিষ্ট পদসমূহ বাংলায় রচিত।

আরো পড়ুন--  বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাপতি সমস্যা, Discuss with best unique 3 points

কারো কারো মতে রায়শেখরের প্রকৃত নাম কবিশেখর বা চন্দ্রশেখর। তিনি নিত্যানন্দ গোস্বামীর বংশধর ছিলেন এবং বৈষ্ণব কেন্দ্র শ্রীখণ্ডবাসী প্রসিদ্ধ বৈষ্ণবাচার্য রুঘুনন্দনের শিষ্য ছিলেন। কেউ কেউ বলেন, কবির জন্মভূমি বর্ধমান জেলার পড়ান গ্রামে। কিন্তু এখানেও বিশ্বাস করার মত কোনো উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়নি। শুধু এইটুকুই মেনে নিতে হয় যে রায়শেখর, গোবিন্দদাসের পরবর্তী কবি।

কবি প্রতিভা

সে যা হোক, রায়শেখর একজন প্রতিভাবান কবি ছিলেন। তিনি বহু বিচিত্র ভাবের পদাবলী রচনা করেছেন। গোবিন্দদাসের আদর্শে ব্রজবুলিতে রচিত তাঁর পদগুলি যথেষ্ট শিল্প সৌন্দর্যমণ্ডিত। তাছাড়া বাংলা ভাষায় রচিত পদগুলিও বেশ স্বাভাবিক ও সুন্দর। হৃদয়ের অনুভূতি বা ভাবাবেগকে তিনি স্বতঃস্ফূর্ত ভাষায় রসসৌকর্য দান করেছেন। হাল্কা ছন্দে, লঘু কৌতুক বা হাস্যরসাত্মক ধামালী জাতীয় পদও কিছু রয়েছে।

গোবিন্দদাসের অনুসরণে লেখা তাঁর বর্ষা অভিসারের পদে উৎকর্ষের পরিচয় রয়েছে। সেই পদটি ধ্বনি ঝংকারময় এবং সেখানে প্রকৃতির রূপচিত্র অপূর্বভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে। শ্রীরাধিকার অভিসারের সময় বর্ষা প্রকৃতির দুর্যোগ, আকাশে মেঘের দারুণ ঘনঘটা, ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমক, বজ্রপাতের বিকট শব্দ, প্রবল বায়ুপ্রবাহ। এই দারুণ দুর্যোগে শ্রীরাধিকা শঙ্কিত ও চিন্তান্বিত। তাঁর অভিসারের পথে বর্ষা প্রকৃতি দুর্দান্ত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে অথচ তাঁর হৃদয়নাথ শ্রীকৃষ্ণ অনেক আগে সংকেত কুঞ্জে চলে গেছেন। তিনি যেতে পারছেন না। মনোবেদনার কথা সখীকে জানাচ্ছেন –

“গগনে অবঘন / মেহ দারুন,

সঘনে দামিনী ঝলকই,

কুলিশ পাতল / শব্দ ঝনঝন

পবন খরতর বলগই।।”

এই কবিতায় ধ্বনি সৌন্দর্য যথেষ্ট এবং পটভূমিকায় রচিত অন্যান্য বৈষ্ণব পদের সঙ্গে এটি সমকক্ষতা দাবি করতে পারে। বর্ষারজনীর চিত্রাঙ্কনে কবির প্রতিভা প্রশংসনীয়। 

আরো পড়ুন--  কবি বিদ্যাপতি ও ব্রজবুলি ভাষা

গোবিন্দদাসের অনুকরণে রায়শেখর ব্রজবুলির পদে ছন্দের চাতুর্য, শব্দালংকারের আড়ম্বর ও শ্রুতিমধুর ধ্বনিব্যঞ্জনা সৃষ্টি করতে পেরেছেন। আর একটি অভিসারের পদ এই –

“কাজর-রুচিহর বয়ানি বিশালা।

তছু পর অভিসার করু ব্রজবালা।।

ঘর সঞে নিকসয়ে যৈছন চোর।

নিশবদ পথগতি চললহি ঘোর।।

উনমত চিত অতি আর আরতি বিথার।

গুরুয়া নিতম্ব নবযৌবন ভার।।”

এখানে বিশাল নিঃশব্দ অন্ধকার রজনীতে চোরের মতো রাধার নিঃশব্দে দুর্গম পথে ঘরের বাহির হওয়া এবং তার মধ্যে তার উন্মত্ত ব্যাকুল আর্তি অভিসারের ধর্মকে স্পষ্ট করেছে। কিন্তু বেশির ভাগ ব্রজবুলির পদ কৃত্রিম। সে তুলনায় বাংলা ভাষায় রচিত রায়শেখরের পদগুলি আরো সরস ও বিশেষ উপভোগ্য –

“সখি, কেমনে দেখাব মুখ।

গোপন পিরীতি বেকত করয়ে, এ বড় মরম দুখ।"

রায়শেখর শ্রীকৃষ্ণের বাল্যলীলা তথা বাৎসল্য রসের কিছু কিছু পদও রচনা করেন, সে সবক্ষেত্রে তাঁর কৃতিত্বও যথেষ্ট, যেমন–

“সকালে আসিহ গোপাল ধেনুগণ লইয়া।

অভাগিনী রৈল তোর চাঁদ মুখ চাইয়া।।

থাকিও শ্রীদামের কাছে চরাইও বাছুরি।

জোরে শিঙ্গা রব দিও পরাণে না মরি।।”

কৃষ্ণ বলরামকে গোষ্ঠচারণে বিদায় দেবার সময় মাতৃহৃদয়ের শঙ্কা ও আকুলতা এখানে জীবননিষ্ঠ ও রসোচ্ছল হয়ে উঠেছে। তা সত্ত্বেও রায়শেখর কবি গোবিন্দদাসের সমতুল্য প্রতিভার অধিকারী নন। তাঁর কবি প্রতিভা স্বরূপ ‘ড. সুকুমার সেনের ভাষায়–

“বৈষ্ণব পদ জগতে তিনি সাহসিক কবি। তাঁহার বিদ্যা এবং বৈদগ্ধ্য যেমন প্রচলিত কাব্যরীতির রসসৌন্দর্য যথাসম্ভব নিষ্কাশন করিতে উৎসাহিত করিয়াছে, তেমনি এমন একটি স্বাধীন চিত্ততা দিয়াছে, যাহা প্রথানুগত্যের মত প্রথা পরিহারেও বিশ্বাস করে।”

Similar Posts

  • জ্ঞানদাস

    কবি জ্ঞানদাস, 16শ শতকের কবি

    কবি জ্ঞানদাস, 16শ শতকের কবি, সাধারণ আলোচনা চৈতন্য-পরবর্তীকালের একজন সুবিখ্যাত বৈষ্ণব পদকর্তা জ্ঞানদাস। বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যে বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস ও গোবিন্দ দাস – এই চারজন কবিই প্রতিনিধি স্থানীয় কবি ও নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। জ্ঞানদাসের জীবন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তেমন কোনো আত্ম-পরিচয় তথ্য পাওয়া যায়নি। বর্ধমান জেলার কাটোয়ার নিকট কাঁদড়া গ্রামের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে আনুমানিক ১৫৩০…

  • অন্যান্য-বৈষ্ণবসাহিত্য

    অষ্টাদশ শতাব্দীর বৈষ্ণব পদ সংকলন গ্রন্থ

    বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের (প্রাগাধুনিক পর্যায়) বৈষ্ণব সাহিত্যের আলোচনায় বৈষ্ণবপদ সংকলন গ্রন্থের প্রসঙ্গ আলোচনা অবশ্য কর্তব্য। এই লেখায় উল্লেখযোগ্য পদসংকলন গ্রন্থের সাধারণ আলোচনার পাশাপাশি অপ্রধান কিছু সংকলন গ্রন্থের আলোচনাও সংযোজিত হয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর বৈষ্ণব পদ সংকলন গ্রন্থ সাধারণ আলোচনা মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের প্রচারিত বৈষ্ণবীয় প্রেমধর্মের প্রভাবে বাংলার রাষ্ট্র ও সমাজজীবনে এবং বাংলা সাহিত্যে বিরাট এক পরিবর্তন সূচিত…

  • বিদ্যাপতি

    বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাপতি সমস্যা, Discuss with best unique 3 points

    বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাপতি সমস্যা ভূমিকা বাংলা সাহিত্যের বিদ্যাপতি সমস্যা কিছুটা জটিল আকার ধারণ করেছে। বিদ্যাপতির প্রতিভা লোকমহিমায় মণ্ডিত হয়েছিল। ফলে অনেক বৈষ্ণব কবি তাঁর ভণিতায় নিজেদের পর চালিয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে পালাগানের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির জন্য কীর্তনীয়াদের দ্বারা অন্য কবির পদে বিদ্যাপতির নাম ঢুকিয়ে দেওয়া অসম্ভব কিছু নয়। বিদ্যাপতি মৈথিলী ভাষায় রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলী রচনা করেন। সমগ্র…

  • বিদ্যাপতি

    কবি বিদ্যাপতির ধর্ম, Discuss with best 3 unique points

    বিদ্যাপতিকে অনেকে বলে থাকে তিনি পঞ্চোপাসক। একজন কবির ধর্ম বিষয়ে পাঠকের কৌতূহল থাকবে তা স্বাভাবিক। এখানে বিদ্যাপতির ধর্ম পরিচয় সম্বন্ধে কিছু আলোচনা করা হল। বিদ্যাপতির ধর্ম ভূমিকা বিচিত্র বিষয়কে অবলম্বন করে বিদ্যাপতির কবিপ্রতিভার অভিব্যক্তি ঘটেছে। তিনি হরি, হর, দুর্গা, কালী ও রাম-সীতা বিষয়ে পদাবলী রচনা করেছেন। বাংলাদেশে বিদ্যাপতির জনপ্রিয়তা রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলীর জন্য। স্বয়ং মহাপ্রভু…

  • গোবিন্দদাস

    কবি গোবিন্দদাস, 16শ শতকের কবি

    কবি গোবিন্দদাস, 16শ শতকের কবি, সাধারণ আলোচনা সূচনা চৈতন্যোত্তর পদাবলী সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি গোবিন্দদাস। সংস্কৃত অলংকার শাস্ত্রে ও বৈষ্ণবীয় দর্শনে সুপণ্ডিত গোবিন্দদাস বিধিদত্ত কবিপ্রতিভার সাহায্যে ছন্দসংগীতের বাণীশিল্পে যে অপূর্ব সৌন্দর্যের জগৎ সৃষ্টি করেছেন সেক্ষেত্রে তিনি জয়দেব-বিদ্যাপতি–ভারতচন্দ্রের সমগোত্রীয়। কিন্তু কাব্যাদর্শের দিক থেকে তিনি বিদ্যাপতিকে বিশেষভাবে অনুসরণ করেছেন। তাই বিদ্যাপতির সঙ্গে তাঁর ভাবগত আত্ময়ীতা বেশি। বিদ্যাপতির অনেক…

  • বিদ্যাপতি

    কবি বিদ্যাপতির রচনাবলী, Discuss with Best Unique 13 Points

    বিদ্যাপতির রচনাবলী শীর্ষক লেখায় বিদ্যাপতির নামে প্রচলিত কিংবা তাঁর রচিত বিভিন্ন রচনার মোটামুটি সংক্ষিপ্ত একটা ধারণা দেওয়া। বিদ্যাপতির রচনাবলী অর্থাৎ তাঁর রচিত সমস্ত রচনা/গ্রন্থের পরিচয়। কবি বিদ্যাপতির রচনাবলী সূচনা বিদ্যাপতি মিথিলার ছয়জন রাজা ও একজন রাণীর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। শিবসিংহের মৃত্যু বা নিরুদ্দেশের পর ভাগ্য বিপর্যয়ের ফলে কবি কিছুকাল পুরাদিত্য নামে অন্য এক রজার আশ্রয়…